বিজ্ঞাপন

ভাঙন আতঙ্কে যমুনাপাড়ের মানুষ, নদীগর্ভে বিলীনের পথে স্কুল

ভাঙন আতঙ্কে যমুনাপাড়ের মানুষ, নদীগর্ভে বিলীনের পথে স্কুল

একদিকে নদীর ফুলে-ফেঁপে ওঠা পানি, অন্যদিকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জীবিকার শেষ সম্বল। যমুনার তীরঘেঁষা সিরাজগঞ্জের কয়েকটি গ্রামের মানুষের কাছে বর্ষা এখন শুধু বৃষ্টির মৌসুম নয়, ঘর হারানোর আশঙ্কার আরেক নাম। কখন নদী এসে গ্রাস করবে বাড়ি, স্কুল কিংবা আবাদি জমি- সেই উৎকণ্ঠা নিয়েই দিন-রাত পার করছে হাজারো মানুষ।

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণের প্রভাবে যমুনা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে জেলার সদর, চৌহালী ও কাজীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যে কোনো সময় বিদ্যালয়টির অবশিষ্ট অংশও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল কাজীপুর উপজেলার পলাশপুর ঘাট এলাকায় নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের দুটি স্থানের অংশ যমুনায় বিলীন হয়ে যায়। এরপরে ৮ জুন চৌহালী উপজেলার চর বিনানই ঘাট এলাকায় প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে ধসে পড়ে। সর্বশেষ ২০ জুন সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা গ্রামে নদীর ডান তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

বর্তমানে সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বড় কয়ড়া, বর্ণি ও কৈগাড়ি জড়তা গ্রাম, রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা, চৌহালীর চর বিনানই এবং কাজীপুরের পলাশপুর ঘাট এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে।

সদর উপজেলার ভাটপিয়ারি গ্রামের আব্দুস ছালাম বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভেঙেছে, আর এখনতো বর্ষা মৌসুম। নদীর মাঝখানে চর পড়ছিল। কিন্তু বালু উঠানোর কারণে পুরা চর নদীর মধ্যে গেছে। এই চরে আমি আখ, গম, কালাইসহ বিভিন্ন ধরনের আবাদ করতাম। এখন আমার কিছুই নাই। পথের ফকির বলা চলে।

কাওয়াকোলা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া বলেন, আমার ইউনিয়নের বড় কয়ড়া, বর্ণি ও কৈগাড়ি জড়তা গ্রামে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যে কোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। দুর্যোগ আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘরে অস্থায়ীভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভাঙনের কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

নদী ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ের খোঁজ শুরু করেছেন। কৃষকদের চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে আবাদি জমি। আর বিদ্যালয় ঝুঁকিতে পড়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান চালিয়ে নিতে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

নদীগর্ভে বিলীন হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফজলুর রহমান বলেন, বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ভ্যাট-ট্যাক্সসহ নিলাম হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা। শিক্ষার্থীদের আশ্রয়ণ প্রকল্পে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরও ভাঙনের মুখে আছে। 

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ হার্ড পয়েন্টে এলাকায় ৩ সেন্টিমিটার ও কাজীপুর মেঘাইঘাট পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার বেড়েছে। তবে পানি বাড়লেও সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৪৮ সেন্টিমিটার ও কাজীপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৯৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, যেসব এলাকায় ভাঙন হয়েছে, সেসব এলাকায় আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। অন্যদিকে আমরা যেসব জায়গায় কাজ করেছি, সেসব জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মেরামত করে দিচ্ছি। 

নাজমুল হাসান/আরএআর