বিজ্ঞাপন

মাঠের ফসলের সঙ্গে বদলাচ্ছে কৃষকের ভাবনাও

মাঠের ফসলের সঙ্গে বদলাচ্ছে কৃষকের ভাবনাও

একসময় তার কাছে কৃষি মানেই ছিল জমিতে ফসল ফলানো। এখন কৃষির সঙ্গে যোগ হয়েছে পুষ্টি, নিরাপদ খাদ্য, ভেজাল শনাক্তকরণ ও রপ্তানিযোগ্য ফসল উৎপাদনের জ্ঞান। কৃষাণী কুলসুমের এই পরিবর্তনের গল্পই যেন উঠে এলো পীরগাছার ‘পার্টনার কংগ্রেস-২০২৬’-এ, যেখানে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (গ্যাপ) ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

রোববার (২৮ জুন) দুপুরে পীরগাছা উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে 'প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)' প্রকল্পের আওতায় এ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়।

পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পার্টনার প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার অশোক কুমার রায়। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) সাইফুল আলম এবং অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মাহমুদা খাতুন।

অশোক কুমার রায় বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএফএডির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন পার্টনার কর্মসূচির মূল লক্ষ্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের কৃষিপণ্য উৎপাদন।

তিনি বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (গ্যাপ) অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করলে কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়বে এবং কৃষক লাভবান হবেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাইফুল আলম বলেন, রাসায়নিক সারের ব্যবহারে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এটি আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। পার্টনার কর্মসূচির মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন, কৃষকের নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের কৃষিপণ্য উৎপাদনে কাজ করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, একসময় পীরগাছা থেকে প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন আলু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছিল। গ্যাপ অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করা গেলে আবারও সেই সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

স্বাগত বক্তব্যে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার খাদ্যের নিরাপত্তা ও গুণগত মানকে হুমকির মুখে ফেলছে। উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (গ্যাপ) অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।

তিনি আরও জানান, পার্টনার প্রকল্পের আওতায় পীরগাছায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৫টি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬টি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫টি ফার্মার ফিল্ড স্কুল (পিএফএস) পরিচালনা করা হয়েছে। এসব স্কুলের কৃষক দল বর্তমানে ফার্মার্স সেন্টার হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গ্যাপ পদ্ধতি অনুসরণ করে উপজেলার বিরাহিম এলাকা থেকে উৎপাদিত আলু বিদেশে রপ্তানিও করা সম্ভব হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়বে, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

কৃষাণী কুলসুম বলেন, প্রশিক্ষণের আগে আমরা শুধু চাষাবাদ জানতাম। এখন পুষ্টিকর খাদ্য, গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি, পারিবারিক পুষ্টি বাগান, ভেজাল খাদ্য শনাক্তকরণ এবং গ্যাপ অনুসরণ করে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের কৌশল শিখেছি। এখন নিজেরা নিরাপদ ফসল উৎপাদন করছি, অন্যদেরও এ বিষয়ে উৎসাহিত করছি।

তিনি আরও বলেন, প্রশিক্ষণে পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করতে পুষ্টি বাগান গড়ে তোলা, গর্ভবতী মা ও শিশুর সুষম খাদ্য, প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল ও আমিষ গ্রহণের গুরুত্ব এবং ভেজাল খাদ্য শনাক্তের সহজ পদ্ধতি শেখানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ও তাম্বুলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ মুকুল, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেস ও এনসিপির উপজেলা প্রধান সমন্বয়কারী আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মুকিত বিন লিয়াকত। এ সময় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং কৃষকেরা উপস্থিত ছিলেন।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এএমকে

বিজ্ঞাপন