বিজ্ঞাপন

ফসল বিপর্যয়ের পর পর্যটনেও টান, বিপাকে হাওরের কৃষক

ফসল বিপর্যয়ের পর পর্যটনেও টান, বিপাকে হাওরের কৃষক

‘আমি গরিব মানুষ, ৫০ হাজার টেহার (টাকা) খেত রাখছি। আরও ৭০ হাজার লাগছে আমার দাওয়া (ফসল ঘরে তোলা) তুলতে। বিরাট ধরনের মাইর (ক্ষতিগ্রস্ত) খাইছি। ধান খেড় যা আছে সব পচছে। আমার চলবারই সমস্যা। অহন একটা কোষা ট্রলার আনছি। কত আর বইয়া খাইবাম, আতো নাই টেহা পয়সা। কোষা ডা যদি চলে বাইতারি, তইলে আমি চলতারবাম। নইলে চলতারবাম না। অবস্থা বিরাট খারাপ। আজগা (আজ) নামায়া লয়াআইছি। খালি বইয়া রইছি। ভাড়া অইলে যায়াম, নইলে বাইত (বাড়িতে) যায়াম গা।’

এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথাগুলো বলছিলেন কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওড়পাড়ের বাসিন্দা ইসব আলী। গত বোরো মৌসমে অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, লোকসান গুনেছেন। ফসল বিপর্যয় কাটাতে পর্যটন খাতে আশা দেখছিলেন। কিন্তু ভরা মৌসুমেও হাওরে পানি নেই। কম পানি থাকায় পর্যটক আসছেন না। তাই ইসব আলীর মতো শতশত মানুষ এখন বিপাকে রয়েছেন।

জানা গেছে, হাওরের কৃষকরা মূলত বোরো ফসলের ওপর নির্ভর করেন। বছরে একটাই ফসল ফলাতে পারেন। একসময় হাওরে প্রচুর মাছ থাকলেও এখন তেমন পাওয়া যায় না। গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার পর থেকে পর্যটকের ঢল নামতে থাকে হাওরে। হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভ্রমণ পিপাসু লোকজন ছুটে আসেন এখানে। তবে এ বছর ভরা মৌসুমেও হাওরে পানি না থাকায় পর্যটকরা তেমন আসছেন না।

সরেজমিনে হাওরবেষ্টিত নিকলীতে গিয়ে দেখা গেছে, বেড়িবাঁধে শতশত ট্রলার-ছোট নৌকা বাঁধা আছে। রাস্তায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পণ্য সাজিয়ে বসে আছেন। হোটেল (খাবারের দোকান) ব্যবসায়ীরা খাবার রান্না করে রেখেছেন। কিন্তু পর্যটক নেই। টুকটাক যারা আসছেন তাদের নিয়ে কাড়াকাড়ি করছেন মাঝি ও হোটেলের কর্মচারীরা। মৌসুমের এই সময়ে পানিতে ভরপুর থাকতো হাওর। কিন্তু এবার পানি খুবই কম। এজন্য পর্যটকরা তেমন আসছেন না।

স্থানীয় বাসিন্দা, মাঝি ও হোটেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, হাওরের হাজারো মানুষ এই মৌসুমটার অপেক্ষায় থাকেন। বছরের ছয় মাস পর্যটন মৌসুম। এই সময়ে জমজমাট থাকে পুরো হাওর। মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যেত পুরো বেড়িবাঁধ। কিন্তু এ বছর ভরা মৌসুম চললেও কাঙ্ক্ষিত পর্যটকের দেখা নেই। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, হাওরে পানি নেই, পর্যটকও নেই। পানি বাড়লে পর্যটক আসবে- এ আশায় বুক বাঁধছেন তারা। 

ট্রলার (ইঞ্জিন চালিত বড় নৌকা) চালক মেহেদী হাসান বলেন, দেখেন ঘাটে হাজার-হাজার ট্রলার বাঁধা রয়েছে। টুকটাক এক-দুইটা ভাড়া মারছে। বেশিরভাগ ট্রলার চালকই অলস সময় পার করছেন। এই সময়ে কী কারো বসে থাকার সুযোগ ছিল? অনেকে এই সময়ের অপেক্ষায় থাকতাম। কিন্তু এ বছর পানি কম থাকায় পর্যটক আসছে না। এতে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ওসমান মিয়া বলেন, আকস্মিক বন্যায় হাওরে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে মানুষের মন এমনিতেই খারাপ। তারপর আবার ভরা মৌসুমেও পানি না থাকায় পর্যটক আসছে না। এতে আমরা হাওরবাসী চরম হতাশ। ফসলের লোকসান পর্যটন খাতে মেটাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এ বছর পানি কম থাকায় পর্যটক আসছে না। এতে আমরা বিপাকে পড়েছি।

তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে পানি বাড়তে পারে। তখন হয়তো পর্যটকের ঢল নামবে। আমাদেরও ব্যবসা ভালো হবে।

টাঙ্গাইল থেকে নিকলী হাওরে ঘুরতে আসা মো. বেলাল হোসেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইনের মাধ্যমে আমরা হাওরের বিষয়ে জানতে পেরেছি। তাই আমরা ২০-২২ জন একত্রিত হয়ে ঘুরতে এসেছি। বেশ ভালো লাগছে। তবে পানি কম। নৌকা ভাড়া নিয়েছি ঘুরবো।

মো. কামরুল হাসান নামে অপর এক পর্যটক বলেন, হাওরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে এসেছি। পানি যদিও কম তারপরও ভালো লাগছে। তবে এখানে আসার রাস্তাটি তেমন ভালো নয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা দরকার।

মো. রাকিবুল ইসলাম নামে স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, নিকলীতে ট্রলার-নৌকা ভাড়ায় কোনো সিন্ডিকেট নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এখানে এসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ট্রলার ভাড়া করতে পারেন। তবে দ্রব্যমূল্য ও খাবারের দাম কিছুটা বেশি রাখা হয়। স্থানীয় প্রশাসন নজরদারি করলে এটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, আগে এখানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের উদ্দেশ্যে সর্তকর্তামূলক সাইনবোর্ড ছিল। লাইফ জ্যাকেট নিয়ে পানিতে নামাসহ নানা সতর্কতা সেখানে উল্লেখ ছিল। কিন্তু সেই সাইনবোর্ড এখন নেই। এগুলো স্থাপন করতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাই।

নিকলী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

এ ব্যপারে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহীদ উল্লাহ বলেন, পর্যটকরা নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদে হাওর ভ্রমণ করতে পারবেন। তাদের নিরাপত্তা ও সেবার দিকটা অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

আরএআর