বিজ্ঞাপন

ওসির মধ্যস্থতায় ঘুষের আড়াই লাখ টাকা ফেরত পেলেন ভুক্তভোগীরা

ওসির মধ্যস্থতায় ঘুষের আড়াই লাখ টাকা ফেরত পেলেন ভুক্তভোগীরা

যশোরের ঝিকরগাছায় দুধে ভেজাল আছে, এমন অভিযোগ তুলে চারজন দুধ বিক্রেতাকে চিলিং সেন্টারের একটি কক্ষে আটকে রেখে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন এএসআই আজিজুল ইসলাম। পরে ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলে ওই চারজনকে মুক্তি দেন তিনি।

বিষয়টি জানাজানি হলে ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়ার মধ্যস্থতায় ভুক্তভোগীদের সব টাকা ফেরত দেন এএসআই আজিজুল ইসলাম।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দিতে গেলে তা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের, বরং ভয়ভীতি দেখিয়ে কপি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। অভিযোগের সেই কপি ঢাকা পোস্টের হাতে পৌঁছেছে।

ভুক্তভোগীরা হলেন, উপজেলার বারবাকপুর ঘোষপাড়া গ্রামের মৃত গৌর চন্দ্র ঘোষের ছেলে তুষার ঘোষ, অশোক ঘোষ ও মিলন ঘোষ এবং তাদের ভাগনে উজ্জ্বল ঘোষ।

জানা যায়, গত ২২ জুন রাত ১০টার দিকে তুষার ঘোষ বারবাকপুর হাটখোলা বাজারে প্রাণ কোম্পানির চিলিং সেন্টারে দুধ বিক্রি করতে যান। এ সময় পূর্ব থেকে সাদা পোশাকে ওৎ পেতে থাকা এসআই আজিজুল ইসলাম ও কনস্টেবল মো. আশিক দুধে ভেজাল আছে বলে তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখেন। পরে একে একে অশোক ঘোষ, মিলন ঘোষ ও উজ্জ্বল ঘোষ দুধ নিয়ে আসলে একই অভিযোগে তাদেরকেও ওই কক্ষে জোরপূর্বক আটকে রাখা হয়। এ সময় প্রাণ কোম্পানির প্রতিনিধিরা পরীক্ষা করে দুধে ভেজাল নেই বলে জানান। তবে তা মানতে নারাজ এএসআই আজিজুল। এ সময় তিনি আঙুল দিয়ে দুধ পরীক্ষা করে বলেন, দুধে হরলিক্স মেশানো।

ভুক্তভোগীরা জানান, ঘটনার একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে আসেন বারবাকপুর শেখপাড়া গ্রামের মনি শেখের ছেলে কামাল হোসেন। পরে তার মধ্যস্থতায় ৫ লাখ টাকা দাবি করেন এএসআই আজিজুল। পরে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকায় রফা হয়। তবে এই মুহূর্তে এত টাকা কোথায় পাবো, টাকা সকালে ম্যানেজ করে দেবো বলে অনুনয়-বিনয় করেন ভুক্তভোগীরা। একপর্যায়ে মধ্যস্থতাকারী কামাল হোসেন এএসআই আজিজুল ও কনস্টেবল আশিকের হাতে ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা তুলে দেন এবং ১৫ হাজার টাকা বাকি রাখেন। শর্ত থাকে সকালে ভুক্তভোগীদের বাড়ি থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা কামাল নিয়ে আসবেন। পরবর্তীতে প্রাণ কোম্পানি দুধে কোনো ভেজাল না পাওয়ায় সেই দুধ গ্রহণ করে।

ভুক্তভোগী তুষার ঘোষ বলেন, সকালে বাড়িতে গিয়ে ঘুষের সেই টাকার জন্য চাপ দেন স্থানীয় কামাল। পরে চারজন বিভিন্ন জায়গা থেকে ধার-দেনা করে কামালের হাতে সম্পূর্ণ টাকা তুলে দিই। তিনি বলেন, আমরা সংখ্যালঘু হওয়ায় আরও টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে একটি পক্ষ। পরে গ্রামবাসীর সঙ্গে আলাপ করে আমরা থানায় অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নিই। ২৪ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে লিখিত অভিযোগ নিয়ে থানার ডিউটি অফিসারের কাজে জমা দিই। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ হওয়ায় তিনি তা নিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। এমন সময় আমাদেরকে থানার ভেতরে ডেকে নিয়ে যান এএসআই আজিজুল। সেখানে নিয়ে তিনি আমাদের ভয়ভীতি দেখান এবং অভিযোগের কপিটি ছিড়ে ফেলেন।

তুষার ঘোষ আরও বলেন, পরবর্তীতে শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে আমরা এক সংসদ সদস্যের শরণাপন্ন হই। তিনি ওসি সাহেবকে ফোন করে বিষয়টির সমাধান করতে বলেন। ওসি সাহেব আমাদেরকে থানায় ডেকে নিয়ে বিষয়টির সমাধান করে দেন। পরে আমরা টাকা ফেরত পেয়েছি।

বারবাকপুর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল মালেক বলেন, ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করতে গেলে কপি ছিড়ে ফেলেন অভিযুক্ত এএসআই আজিজ। পরে তারা আমাকে জানালে স্থানীয় অন্যান্য বিএনপি নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সংসদ সদস্য সাবিরা সুলতানার কাছে যাই। পরে ওসি সাহেব আমাদের সামনে এএসআই আজিজকে ডেকে এক ঘণ্টার মধ্যে টাকা ফেরত দিতে বলেন এবং পরের দিন ওই এএসআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন। পরে ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত পেয়েছেন।

তৃতীয় ব্যক্তি কালাম হোসেনের বিষয়ে তিনি বলেন, কামাল সব সময় থানার মোড়ে থাকেন। এলাকায় তিনি পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত বলেও জানান।

জানতে চাইলে প্রাণের ঝিকরগাছার এরিয়া ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, বারবাকপুর চিলিং সেন্টারে আমাদের প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাকে জানান, সেন্টারে পুলিশ এসে দুধে ভেজাল আছে বলে তদন্ত করছে। আমি তাকে পরীক্ষা করতে বলি। তিনি জানান, পরীক্ষা করেছি, তবে দুধে কোনো ভেজাল নেই। তবুও পুলিশ শুনছে না। অবস্থা বেগতিক দেখে রাত ১১টার দিকে আমি সেন্টারে উপস্থিত হই। ততক্ষণে পুলিশ চলে গেছে।

অভিযুক্ত এএসআই আজিজুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বারবাকপুর বাজারের প্রাণ চিলিং সেন্টারে কনস্টেবল আশিককে সঙ্গে করে গিয়েছিলাম সত্য। তবে অভিযানের একপর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দারা আমাদেরকে চলে যেতে বললে আমরা চলে আসি। চার দুধ বিক্রেতাকে আটকে রেখে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কামাল নামে এক ব্যক্তি ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন বলে জানান।

তিনি আরও বলেন, থানায় গেলে অভিযোগের কপি ছিড়ে ফেলার তথ্য মিথ্যা। তবে কপিতে আমার নাম ভুল ছিল। তিনি বলেন, ওই চারজন থানায় গেলে ওসি স্যার আমাকে ডেকে সব কিছু জেনে কামালকে এক ঘণ্টার মধ্যে অ্যারেস্ট করতে বলেন। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি মিটমাট করে নিয়েছেন।

তবে ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া জানান, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।

সিনিয়র এএসপি (নাভারণ সার্কেল) মো. আরিফ হোসেন বলেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন। আমি ওসি সাহেবকে বলেছি, তৃতীয় ব্যক্তি কামালকে অ্যারেস্ট করে যদি পুলিশের সংশ্লিষ্টতা পায় তাহলে ব্যবস্থা নিতে। এ ঘটনায় যদি পুলিশের সংশ্লিষ্টতা থাকে তবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেজওয়ান বাপ্পী/এএমকে