বিজ্ঞাপন

গাইবান্ধায় বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই তিস্তার পানি, ২৫ পয়েন্টে ভাঙন

গাইবান্ধায় বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই তিস্তার পানি, ২৫ পয়েন্টে ভাঙন

গাইবান্ধায় তিস্তা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আজই (সোমবার) সন্ধ্যা নাগাদ বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড সংশ্লিষ্টরা।

গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার বিকেল ৩টা থেকে আজ সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত গেল ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৭৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

এছাড়াও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৯১ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ৩১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৫০ সেন্টিমিটার ও গোবিন্দগঞ্জের চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি বিপৎসীমার ৪০৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চলমান বন্যার মৌসুমে পানি কমবেশির দোলাচল হলেও গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানিই এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ভাঙন সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধার প্রধান নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে দেখা দেয় ভাঙন। কোথাও কোথাও ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে বসতভিটা, আবাদি জমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চলমান পানি বৃদ্ধির প্রভাবে জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙনের কথা জানিয়েছে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলায় গত কয়েকদিনে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধির ফলে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত এক সপ্তাহের অব্যাহত ভাঙনের ফলে সদর, ফুলছড়ি,  সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্লাপুর উপজেলার নদী তীরবর্তী অন্তত ৮ শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নদী পাড়ের মানুষ। 

ভাঙনকবলিত এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে সুন্দরগঞ্জের কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালির খামার গ্রামের শখের বাজার, হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ী, রাঘব, চন্ডিপুর ইউনিয়নের উত্তর সীচা, কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, কেরানির চর, মিন্টু মিয়ার চর ও বাদামের চর। এসব এলাকার অন্তত দুই শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও দেড় শতাধিক বিঘা আবাদি জমি নদীতে ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। 

সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজু মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার ইউনিয়নের ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লাল চামার ও  ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কেরানীর চর ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে। অব্যহত ভাঙনে অন্তত ২০০ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। শতাধিক বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়েছে।

অন্যদিকে ফুলছড়ি উপজেলার ভাঙনকবলিত এলাকার মধ্যে রয়েছে কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট, রসুলপুর, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর, ফজলুপুর ইউনিয়নের মধ্য ও দক্ষিণ খাটিয়ামারীর চর ও চর চৌমোহন।

চর চৌমোহনে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ইতোমধ্যে অন্তত দুই শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে চৌমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকশ বিঘা আবাদি জমি ও বিপুল সংখ্যাক গাছপালা। এ চরের ভাঙনের শিকার মানুষগুলো ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন নতুন কোনো চরে। 

এছাড়াও সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামেও নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। 

ফজলুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনছার আলী মন্ডল ঢাকা পোস্টকে বলেন, পানি বাড়ার শুরু থেকেই এই ইউনিয়নের অনেকগুলো এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ইউনিয়নের মধ্য ও দক্ষিণ খাটিয়ামারীর চর ও চর চৌমোহনসহ বেশ কয়েটটি এলাকার অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবার নদী ভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়েছেন। 

উরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা কামাল পাশা ঢাকা পোস্টকে বলেন, নদীতে পানি বাড়তে শুরু করায় রতনপুরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি বাড়ার সাথে সাথে অন্যান্য এলাকায় ভাঙনের আশঙ্কা আছে।

সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের সিধাইল এলাকার নদী ভাঙনে ইতোমধ্যে ২০টি পরিবার  ভিটেমাটি হারিয়েছে। ভাঙনের মুখে আছে আরও অনেক পরিবার। সেখানকার একমাত্র সিধাইল কওমি মাদরাসটিও রয়েছে ভাঙনের মুখে। 

সিধাইল কওমি মাদরাসার মোহতামিম মাওলানা হাসান আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভাঙনের শিকার হয়ে ইতোমধ্যে আমরা মাদরাসার দুইটি ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছি। আরও একটি ঘর ও একটি মসজিদ ঘর দ্রুতই সরি নিতে হচ্ছে, অন্যথায় নদীর পেটে যাবে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, পানি বাড়ার সাথে সাথে জেলার নদী তীরবর্তী অঞ্চল ও চরাঞ্চলে ২০ থেকে ২৫টি স্পটে ভাঙন শুরু হয়েছে। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভাঙনকবলিত এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে কাজ করছি।

মাসুম বিল্লাহ/আরএআর

বিজ্ঞাপন