দেশীয় মাছের অন্যতম প্রধান প্রজননক্ষেত্র নেত্রকোণাসহ হাওরাঞ্চলগুলোতে দীর্ঘ এক মাস পর আবারও শুরু হয়েছে মাছ ধরা। তবে কর্মে ফিরলেও প্রান্তিক জেলেদের মধ্যে আনন্দের চেয়ে ক্ষোভ ও হতাশাই বেশি। সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে সোমবার (২৯ জুন) সকাল থেকেই জেলেরা জাল ও নৌকা নিয়ে হাওরে নেমেছেন।
প্রান্তিক জেলেদের অভিযোগ, মা মাছ ও পোনা রক্ষায় সরকারের নেওয়া এই উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে ব্যর্থ হয়েছে। দিনের বেলা প্রশাসনের কিছুটা তৎপরতা থাকলেও রাতের আঁধারে প্রভাবশালী চক্র অবাধে মাছ ধরেছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে এবং কর্মহীন থেকে সাধারণ জেলেরা চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
চলতি বছর পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলের একমাত্র বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষক ও জেলে পরিবারগুলোর শেষ ভরসা ছিল দেশীয় মাছ। কিন্তু ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ অ্যাক্ট, ১৯৫০’ অনুযায়ী গত ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত প্রথমবারের মতো হাওরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করায় তারা চরম বিপাকে পড়েন।
নিষেধাজ্ঞার পুরো সময় আইন মেনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকলেও নেত্রকোণাসহ হাওর অধ্যুষিত জেলার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কোনো সরকারি বা বেসরকারি খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা পাননি। শুধু নেত্রকোণা জেলায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৩৯৩টি। বিকল্প আয়ের উৎস বা সরকারি সহায়তা না থাকায় এই এক মাসে হাজার হাজার পরিবারকে চড়া সুদে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। অর্থকষ্টে অনেক জেলের সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে এই পরিবারগুলো।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ জানান, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেটসহ মোট সাতটি হাওর জেলায় মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো সরকারি গেজেটের মাধ্যমে এই ৩১ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
তিনি জানান, ২৫ জুন পর্যন্ত প্রায় ৫৫টি অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রায় সাত শত চায়না দুয়ারী জাল এবং ২৩৭টি কারেন্ট জাল জব্দ করে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। একটি জালের গুদাম সিলগালা করে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড এবং পুরো মাসে মোট ৫৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জেলেদের সহায়তার বিষয়ে হারুন অর রশীদ বলেন, প্রথমবার এই নিয়ম চালু হওয়ায় এবার কোনো প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে জেলেদের তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে এবং আগামী বছর থেকে ভিজিএফ বা ভিজিডির আওতায় এককালীন খাদ্য বা অর্থ সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার সুবাদে আগামীতে দেশীয় মাছের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারসিক- এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ওয়াহেদুর রহমান বলেন, বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত না করে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাছের প্রজনন রক্ষা করা অসম্ভব। দেশীয় মাছের বংশবৃদ্ধি রক্ষা করা যেমন সময়ের দাবি, তেমনি কর্মহীন হয়ে পড়া হাজারো প্রান্তিক জেলের মুখে অন্ন জোগানোর দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আগামী বছর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে নিশ্চিত প্রণোদনা এবং রাতের বেলা অবৈধভাবে মাছ ধরা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে।
চয়ন দেবনাথ মুন্না/আরএআর
