বিজ্ঞাপন

বাইরে টাটকা, ভেতরে পচন— দুশ্চিন্তায় খাগড়াছড়ির আমচাষিরা

বাইরে টাটকা, ভেতরে পচন— দুশ্চিন্তায় খাগড়াছড়ির আমচাষিরা

চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন হলেও রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণে বিপাকে পড়েছেন খাগড়াছড়ির আমচাষিরা। পর্যাপ্ত পরিচর্যা ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় হতাশ বাগান মালিকরা। একই সঙ্গে বাজারে নিম্নমানের আম আসায় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

চাষিদের দাবি, চলতি মৌসুমে জেলি সিড রোগের আক্রমণে কয়েক হাজার মেট্রিক টন আম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ রোগে আমের আঁটির দুই পাশের অংশ অতিরিক্ত পেকে নরম, আর্দ্র ও জেলির মতো হয়ে যায়। বাইরে থেকে স্বাভাবিক ও সতেজ দেখালেও ভেতরের অংশ পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়।

জেলার বিভিন্ন উপজেলার আমবাগান ঘুরে দেখা গেছে, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর আম্রপালি জাতের ফলন ভালো হয়েছে। গাছে প্রচুর আম ধরলেও সংগ্রহের সময় মাছি পোকার আক্রমণ, ছত্রাকজনিত রোগ এবং আমের গায়ে কালচে দাগের কারণে বাজারমূল্য কমে গেছে।

আমচাষিদের অভিযোগ, বাগান পরিচর্যায় ব্যবহৃত ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। একাধিকবার স্প্রে করেও রোগ ও পোকা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চাষিদের ভাষ্য, সার, সেচ, আগাছা পরিষ্কার ও ওষুধ প্রয়োগে প্রতি মৌসুমে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও অনেক আম গাছে থাকতেই পোকায় আক্রান্ত হয়েছে। আবার বাইরে থেকে ভালো দেখালেও কাটার পর অনেক আমে পোকা বা পচন দেখা যায়।

বর্তমানে বাজারে আম্রপালি আম প্রতি কেজি ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বারি-৪ জাতের আম ৩০ টাকা, রাঙ্গুই ১০ টাকা, গৌড়মতি ৩০ টাকা, ব্যানানা ৫০ টাকা, কিউজাই ৫০ টাকা এবং রেড পালমার ও রেড আইভরি ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে প্রতি মণে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪৪ কেজি দিতে হওয়ায় চাষিদের লোকসান আরও বাড়ছে।

কৃষি উদ্যোক্তা অংপ্রু মারমা জানান, তার ১০ একর আমবাগানে বারি-৪, আম্রপালি ও রাঙ্গুই জাতের আম গাছ রয়েছে। চলতি বছরে বাগান পরিচর্যায় প্রায় ৪ লাখ টাকা ব্যয় হলেও প্রায় ৩ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

তিনি বলেন, শুরু থেকে ১০ বারের বেশি স্প্রে করেও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তাঁর বাগানে ২০ মেট্রিক টনের বেশি রাঙ্গুই আম রয়েছে, কিন্তু বাজারদর এত কম যে আম সংগ্রহের শ্রমিকের মজুরিও উঠছে না। 

তিনি অভিযোগ করে বলেন, কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের পরামর্শ পাননি এবং নিম্নমানের কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহারের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এভাবে চললে আম বাগান কেটে অন্য ফসল করা ছাড়া উপায় নেই।

আমচাষি মো. সাদ্দাম হোসেন জানান, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা ও খাগড়াছড়ি সদরে তাঁর সাতটি লিজ নেওয়া আমবাগান রয়েছে। শুধু বাগান পরিচর্যাতেই এ বছর ৭০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। লিজসহ মোট বিনিয়োগ কোটি টাকার বেশি। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা লোকসান হতে পারে। সরকারি টোল, চাঁদাবাজি এবং রোগ-পোকার কারণে আমের দাম কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

আরেক আমচাষি মো. মিলন বলেন, এ বছর গাছে প্রচুর আম ধরলেও মাছি পোকার আক্রমণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল নষ্ট হয়েছে। কয়েক দফা ওষুধ প্রয়োগ করেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।

ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বাজারে আসা অধিকাংশ আমের গায়ে কালচে দাগ রয়েছে। আবার অনেক আম বাইরে থেকে ভালো দেখালেও কাটার পর ভেতরে পচন, জেলি সিড রোগ বা সাদা লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। এতে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ায় বিক্রিও কমেছে।

খাগড়াছড়ি শহরের আম ব্যবসায়ী শাহেদ হোসেন বলেন, আগে খাগড়াছড়ির আম্রপালি আমের আলাদা সুনাম ছিল। কিন্তু এবার অনেক আমের রং কালচে এবং ভেতরে সমস্যা থাকায় ক্রেতারা কিনতে দ্বিধা করছেন। ফলে বাজারে দামও কমে গেছে।

চাষিদের অভিযোগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পর্যাপ্ত তদারকি ও মাঠপর্যায়ের পরামর্শের অভাব রয়েছে। সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, উপযুক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ এবং নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় বাজারে নিম্নমানের কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক বিক্রি হচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে চাষিদের।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ওঙ্কার বিশ্বাস বলেন, শুধু কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করলেই হবে না। বাগানের আগাছা পরিষ্কার না করলে মাছি পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এছাড়া অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহার, আবহাওয়ার পরিবর্তন, আর্দ্রতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ না করার কারণেও রোগবালাই ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তিনি জানান, আক্রান্ত ফল দ্রুত অপসারণ, ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার এবং অনুমোদিত বালাইনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষি বিভাগ নিয়মিত চাষিদের সচেতন করতে কাজ করছে।

ওঙ্কার বিশ্বাস আরও বলেন, পার্বত্য জেলায় ফল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় শুধু ফল সংরক্ষণ নয়, ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগও জরুরি। ফল চাষিদের রক্ষায় এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।

মোহাম্মদ শাহজাহান/আরকে

বিজ্ঞাপন