বিজ্ঞাপন

রং-তুলি নয়, ঘুণের গুঁড়াতেই আঁকেন জীবনের ছবি

রং-তুলি নয়, ঘুণের গুঁড়াতেই আঁকেন জীবনের ছবি

ময়মনসিংহের কাঁচিঝুলি। ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট একটি নার্সারি। চারপাশে সবুজের সমারোহ, বাইরে থেকে দেখলে যা নিছকই একটি সাধারণ গাছের দোকান। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। সেখানে রং-তুলি নেই, নেই কোনো দামি ক্যানভাসও। আছে শুধু ফেলে দেওয়া ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়া, আঠা আর নিখাদ ধৈর্য। সেই অবহেলিত গুঁড়ার ছোঁয়াতেই জন্ম নেয় শিল্প; যেখানে ফুটে ওঠে মুখ, মুখাবয়ব, প্রকৃতি আর সময়ের নানান প্রতিচ্ছবি। এই ব্যতিক্রমী শিল্পজগতের কারিগর ইকবাল হোসেন, যিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘ঘুণশিল্পী’ নামে।

এই ছোট্ট ছাপার ছাউনি ঘেরা নার্সারিতেই দিনের বড় একটি সময় কাটান ইকবাল হোসেন ওরফে মোহন আকন্দ (৪৬)। একদিকে গাছের পরিচর্যা ও বিক্রি, অন্যদিকে ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়া দিয়ে নিখুঁত হাতে গড়ে তোলা চিত্রকর্ম। তার কাজে নেই রং-তুলি, নেই প্রচলিত ক্যানভাস। আছে শুধু কাঠের গুঁড়া, আঠা আর অসীম ধৈর্য। এই উপকরণেই ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে ওঠে কাজী নজরুল ইসলাম, জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে রানি এলিজাবেথসহ নানা পরিচিত মুখ ও নান্দনিক দৃশ্যপট।

নিজেকে তিনি পরিচয় দেন ‘ঘুণশিল্পী’ হিসেবে। বহু বছরের চর্চায় গড়ে তোলা এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম এখন শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পৌঁছে গেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও।

সম্প্রতি তার নার্সারিতে গিয়ে দেখা যায়, নতুন একটি ছবি আঁকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। সামনে রাখা ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়া চালুনি দিয়ে চেলে ময়লা আলাদা করছেন। পরিষ্কার গুঁড়া বোতলে যত্ন করে সংরক্ষণ করছেন পরবর্তী কাজের জন্য। আলাপচারিতায় জানালেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ি থেকে ঘুরে ঘুরে এসব গুঁড়া সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর কাগজের বোর্ডে কালো কাপড় লাগিয়ে ক্যানভাস তৈরি করেন। পেনসিল দিয়ে কাঠামো এঁকে সেখানে আঠা লাগান। তারপর আঠার ওপর ছড়িয়ে দেন কাঠের গুঁড়া। শুকিয়ে গেলে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে কাঙ্ক্ষিত প্রতিচ্ছবি।

তবে এই শিল্পযাত্রার শুরুটা ছিল অনেকটা কৌতূহল থেকে। অভাব-অনটনের কারণে অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি ইকবাল। জীবিকার তাগিদে শিখেছিলেন চুমকি, জরি, কটনবাড ও দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে ওয়ালম্যাট তৈরির কাজ। দীর্ঘদিন সেসব তৈরি করে বিক্রিও করেছেন।

১৯৯৮ সালে এক বন্ধুর বাড়ি বদলানোর সময় খাটের নিচে পড়ে থাকা কিছু ঘুণে ধরা কাঠের গুঁড়া তার নজরে আসে। তখন মনে প্রশ্ন জাগে, জরি বা চুমকি দিয়ে যখন ওয়ালম্যাট তৈরি করা যায়, তাহলে কাঠের গুঁড়া দিয়েও কি কিছু করা সম্ভব নয়? সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কিছুদিনের চেষ্টার পর আঠার সাহায্যে কাপড়ে কাঠের গুঁড়া লাগিয়ে তৈরি করেন একধরনের ওয়ালম্যাট। এরপর ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে একের পর এক ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম।

ইকবাল জানান, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করায় এখন আর কাঁচামালের অভাব হয় না। পরিচিতজনেরা নিজেরাই ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়া এনে দেন, আবার অনেক সময় তিনি সংগ্রহ করেও আনেন। পরে সেগুলো পরিষ্কার করে বোতলে সংরক্ষণ করেন।

তিনি জানান, ছবিতে মূলত দুই ধরনের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। মেহেগনি, কাঁঠাল ও কেরোসিন কাঠের গুঁড়ায় সবচেয়ে ভালো কাজ হয়। সব কাঠের গুঁড়ার রংও এক নয়। একটি দৃশ্যকে জীবন্ত করে তুলতে সাদা ও মলিন দুই ধরনের গুঁড়ারই প্রয়োজন হয়।

এই শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো আঠা লাগানো। ইকবাল বলেন, কাজটি খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। আঠা সামান্য এলোমেলো হয়ে গেলেই কাঠের গুঁড়াও ছড়িয়ে পড়বে। তখন পুরো শিল্পকর্ম নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

মানুষের একটি প্রতিকৃতি তৈরি করতে তার ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। আর প্রাকৃতিক দৃশ্যের চিত্রকর্ম তৈরি হয় এক থেকে দুই দিনে। সাইজভেদে তার শিল্পকর্মের দাম ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ছোট ওয়ালম্যাট ৩০০ টাকায়, মাঝারি আকারের শিল্পকর্ম ১ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় এবং প্রতিকৃতি বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায়।

তার এসব চিত্রকর্মের ক্রেতাদের মধ্যে বিদেশি ক্রেতা বেশি। এছাড়াও স্থানীয় লোকজন ও বিভিন্ন অফিসে চিত্রকর্ম দিয়েও কিছু আয় হয়।

২০০০ সালে প্রথমবারের মতো নিজের শিল্পকর্ম নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। পরে ময়মনসিংহ নগরের জয়নুল আবেদিন উদ্যানে আরও কয়েকটি প্রদর্শনী করেছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ভিশনের মাধ্যমে তার কিছু শিল্পকর্ম যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড ও কেনিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছেছে।

বর্তমানে নার্সারি ও শিল্পকর্ম বিক্রির আয়েই স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চালাচ্ছেন ইকবাল হোসেন। যে ঘুণে কাটা কাঠের গুঁড়াকে মানুষ সাধারণত মূল্যহীন মনে করে ফেলে দেয়, সেই গুঁড়াকেই তিনি শিল্পে রূপ দিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের আলাদা পরিচয়। আর সেই পরিচয়েই আজ তিনি সবার কাছে পরিচিত ‘ঘুণশিল্পী’ ইকবাল হিসেবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে এই শিল্পী বলেন, চিত্রকর্ম বিক্রির টাকায় সুবিধাবঞ্চিত, পথশিশুদের জন্য স্কুল-কলেজ করার ইচ্ছা আছে। এছাড়া ভবিষ্যতে নিজের একটা আর্ট গ্যালারি করার স্বপ্নও দেখেন তিনি।

কাঁচিঝুলি এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল হালিম বলেন, অনেক বছর ধরেই ইকবাল ভাইকে এই কাজ করতে দেখছি। প্রথম দিকে মানুষ বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও এখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার শিল্পকর্ম দেখতে আসে। আমাদের এলাকার জন্য এটি গর্বের বিষয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহীন মিয়া বলেন, ঘুণে ধরা কাঠের গুঁড়া দিয়ে যে এত সুন্দর ছবি তৈরি করা যায়, সেটা ইকবাল ভাইকে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। তার কাজ নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল কিছু করার অনুপ্রেরণা দেয়।

ময়মনসিংহ নগরীর বাসিন্দা সুমাইয়া রহমান বলেন, কিছুদিন আগে আমি তার কাছ থেকে একটি ওয়ালম্যাট কিনেছি। সাধারণ ছবির চেয়ে এটি একেবারেই আলাদা। ঘুণের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হওয়ায় শিল্পকর্মটির মধ্যে একটি স্বকীয়তা আছে, যা ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।

টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ইকবাল হোসেনের শিল্পকর্ম প্রথম দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। পরে একটি প্রতিকৃতি তৈরি করে নিই। তার কাজের সূক্ষ্মতা এবং ধৈর্য সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এমন ব্যতিক্রমী শিল্পীকে আরও বেশি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া উচিত।

ইকবালের এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম শুধু স্থানীয়দের নয়, ক্রেতাদেরও মুগ্ধ করছে। স্থানীয়দের মতে, তার সৃজনশীল উদ্যোগ ময়মনসিংহের জন্য একটি অনন্য পরিচয় তৈরি করেছে। ক্রেতারা জানান, মূল্যহীন উপকরণকে শিল্পে রূপ দেওয়ার এই দক্ষতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় চারুশিল্পী পর্ষদের সভাপতি মো. রাজন বলেন, একাডেমিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও ইকবালের নিষ্ঠা ও নিয়মিত চর্চা তার শিল্পকে আলাদা করেছে। ঘুণের গুঁড়া দিয়ে কাজ করার এই ধারা লোকশিল্পের একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তার জানামতে, ময়মনসিংহে বর্তমানে এমন কাজ একমাত্র ইকবালই করছেন। তাই এই শিল্পচর্চা ধরে রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

এসএইচএ