হাসপাতালের কার্যক্রম চালু, ক্লিনিক্যাল ক্লাস নিশ্চিত, শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন দাবিতে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক অবরোধ করেছেন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টাব্যাপী সড়ক অবরোধ করেন সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা জানান, দাবির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সকালে প্রথমে কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে কলেজের সামনে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দেন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি চলছিল।
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহপরান ভুঁইয়া ও তামিমা রহমান, দ্বিতীয় ব্যাচের পিয়াস চন্দ্র দাস, শামসিয়া তাবাসসুম মাইমা এবং সাইদুল ইসলাম সাকিব।
শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজে হাসপাতালের কার্যক্রম চালুর আশ্বাস দীর্ঘ এক বছর ধরে দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাদের ভাষ্য, এখন আর আশ্বাস নয়, হাসপাতাল কবে চালু হবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে হবে।
তাদের দাবি, ৫০০ শয্যার হাসপাতালের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও হাসপাতাল চালু না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে চিকিৎসা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে জেলার মানুষও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না। হাসপাতালের ১০ তলা ভবন প্রস্তুত থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতায় কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, মেডিকেল কলেজের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ওয়ার্ডভিত্তিক ক্লিনিক্যাল ক্লাস করতে হয়। কিন্তু হাসপাতাল চালু না থাকায় সেই সুযোগ মিলছে না। গত বছরের জুনে হাসপাতালের কার্যক্রম চালুর আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাল চালু, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দাবিতে গত ২১ জুন থেকে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। গত ১০ দিন ধরে তারা ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি পালন করছেন। সোমবার জেলা শহরে সমাবেশ এবং তার আগের দিন একই স্থানে সড়ক অবরোধ কর্মসূচিও পালন করা হয়।
পাঠদান শুরুর পাঁচ বছরেও জনবল ও অবকাঠামোগত দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল চালু না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই দাবিতে গত বছরও আন্দোলনে নামলেও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় এবার দ্বিতীয় দফায় শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে সড়কে নেমেছেন তারা।
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম সাকিব বলেন, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। আমাদেরকে আন্দোলন করতে হচ্ছে। শিক্ষক শূন্যতার কারণে আমাদের আগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের সিলেবাসের অনেক কিছুই পড়ানো হয়নি।
একই বর্ষের শিক্ষার্থী পৃথ্বীরাজ চৌধুরী বলেন, ‘হাসপাতাল চালু না হওয়ায় ক্লিনিক্যাল ক্লাস না হলে আমরা ডাক্তার হবো কীভাবে। কলেজে অনেক বিষয়ের শিক্ষকের পদ শূন্য। এভাবে থাকলে আমরা কীভাবে ডাক্তার হবো। গত বছর আন্দোলনের পর দুটি বাসের ব্যবস্থা হয়েছে। বাসে করে ২০ কিলোমিটার দূরে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ক্লাসে যেতে হয়। তিন ব্যাচের ১৭৫ জন শিক্ষার্থী দুইটি বাসে যাই, কিন্তু সদর হাসপাতালেও ডাক্তার সংকটের কারণে শেখানোর কেউ থাকেন না।’
সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ বলেন, সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে। বর্তমানে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুনামগঞ্জে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদনের পর ২০২০ সালের মার্চে সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ৩৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১ হাজার ১০৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকার এ প্রকল্পের মেয়াদ বিভিন্ন দফায় বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থায়ী ক্যাম্পাসে ২০টি ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। ২০২১ সালে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২০২৪ সালে স্থায়ী ক্যাম্পাসে পাঠদান শুরু হলেও, হাসপাতাল এখনো চালু না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।
তামিম রায়হান/এসএইচএ
