উপকূলীয় জেলা বরগুনায় ড্রাগন ফল চাষ করে সাড়া ফেলেছেন হাসানুল হক উজ্জ্বল নামে এক স্কুল শিক্ষক। চার বছর আগে মাত্র একটি বাগান দিয়ে চাষ শুরু করলেও বর্তমানে তার ড্রাগন ফলের বাগান সংখ্যা তিনটি। এসব বাগান থেকে উৎপাদিত ফল বরগুনার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করছেন তিনি। বর্তমানে তার তিনটি বাগান থেকে বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়।
এছাড়া তিনি ফল বিক্রির টাকায় দোতলা একটি বাড়ি নির্মাণসহ বাগানে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে ৮ থেকে ১০ জনের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছেন।
হাসানুল হক উজ্জ্বল শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি ড্রাগন ফল চাষে অল্প সময়ের মধ্যেই সফলতা অর্জন করেছেন। তার এ সাফল্যের কারণে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাকে বরগুনার কৃষিতে একজন ‘আইকন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসানুল হক উজ্জ্বল বরগুনা সদর উপজেলার ৯ নম্বর এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি ওই এলাকার নিমতলী আজিজাবাদ চরমাইঠা বিদ্যালয়ের কৃষি বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক। বাড়ির আশপাশের জমিতে বাড়তি আয়ের একটি মাধ্যম তৈরি করতেই শিক্ষাকতার পাশাপাশি ড্রাগন ফলের বাগান করতে আগ্রহী হন তিনি। পরে ২০২১ সালে বাড়ির সামনে প্রায় দুই একর জমিতে ১ হাজার ১০০টি খুঁটি স্থাপন করে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেন। তবে শুরুটা পরীক্ষামূলক হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ভালো ফল উৎপাদনে সফল হন তিনি। পরে আরও এক একর জমি বাড়িয়ে বর্তমানে তিন একর জমিতে তিনটি ড্রাগন ফলের বাগান তৈরি করেছেন। এসব বাগান থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়। এছাড়া লাভজনক হওয়ায় আরও দুই একর জমিতে বাগান করে ড্রাগন চাষ করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন শিক্ষক উজ্জ্বল। শুধু তাই নয়, বর্তমানে তার বাগানে ফলের মৌসুমে এলাকার অন্তত ৮ থেকে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে হাসানুল হক উজ্জ্বলের ড্রাগন ফলের বাগান ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি বাগানেই বিশেষ ব্যবস্থায় পিলারের সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে ড্রাগন গাছ। বাগানে চাষ করা এসব গাছের বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় ঝুলছে ড্রাগন ফল ও ফুল। কোথাও সদ্য ফোটা সাদা ফুল, কোথাও কাঁচা ফল, আবার কোথাও পাকা টকটকে লাল ফল। আর প্রতিদিন সকাল হলেই এসব পাকা ফল সংগ্রহ করে সাইজ অনুযায়ী সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করেন বাগানে নিযুক্ত কর্মরত নারী ও পুরুষরা। পরে সংগ্রহ করা বাগানের তাজা ফল পৌঁছে দেওয়া হয় বিভিন্ন এলাকার পাইকার ও ব্যবসায়ীদের কাছে। এছাড়া শিক্ষক উজ্জ্বল তিনটি বাগান থেকে প্রতি বছর ভালো টাকা আয় করায়, এখন আরও দুই একর জমিতে ড্রাগন বাগান সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছেন। তার এমন সফলতা দেখে বর্তমানে এলাকার অনেকে বাসিন্দারাই ড্রাগন চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
হাসানুল হক উজ্জ্বলের সফলতা দেখে একই এলাকার বাসিন্দা ও তার চাচাতো ভাই মো. কামাল নিজ জমিতে স্বল্প পরিসরে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেছেন। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, উজ্জ্বল আমার চাচাতো ভাই। তার দেখাদেখি আমার জমিতেও ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেছি। বাগান তৈরিতে তার পরামর্শ এবং সহযোগিতা পেয়েছি। বর্তমানে আমার ছোট একটি বাগান থেকে প্রায় তিন লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে শুধু ড্রাগন ফল থেকে আমার এক লাখ টাকা লাভ হয়।
উজ্জ্বলের বাগানে শুরু থেকে কাজ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুমন। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বরগুনায় এর আগে কোথাও ড্রাগন ফলের বাগান ছিল না। ২০২১ সালে মোবাইলে ভিডিও দেখে এই বাগানটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে একটা বাগান করলেও এখন বাগান সংখ্যা তিনটি। বাগানগুলোতে আমিসহ প্রায় সাত-আটজন কাজ করি। আমরা এখান থেকে প্রতি মাসে ভালো বেতন পাই।

সেলিম মল্লিক নামে আরেকজন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা ড্রাগন ফলের বাগানে কাজের সুযোগ পেয়েছি। মাস শেষে আমি ১৮ হাজার টাকা বেতন পাই। এ টাকায় পরিবার নিয়ে ভালো আছি। আমরা বাগানের সংখ্যা আরও বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করছি।
কিভাবে বাগান তৈরিতে আগ্রহী হলেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক উজ্জ্বল ঢাকা পোস্টকে বলেন, এক সময় আমার বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের কাঠের গাছ ছিল। এসব গাছের বয়স ৩০ থেকে ৪০ বছর হলে তেমন একটা বিক্রি করা যায় না। পরে বিকল্প চিন্তায় অনেকের পরামর্শ নিয়েছি। আম, লিচু, মালটাসহ ড্রাগন ফলের বিভিন্ন বাগান পরিদর্শন করেছি। এসব বাগান দেখে আমার মনে হয়েছে, ড্রাগন ফলের বাগান করলে ভালো লাভ করা যাবে। এরপর ২০২১ সালে আমি প্রথমে দুই একর জমিতে ড্রাগন চাষ শরু করি। এক বছর পরেই ২০২২ সালে বাগান থেকে সাড়ে ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছি। পরে আরও এক একর জমি বাড়িয়ে ২০২৩ সালে ৩৬ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছি। তবে ২০২৪ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হওয়ায় আমার বাগান কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে ওই বছর বাগান থেকে ১৮ লাখ টাকার ফল বিক্রি হলেও ২০২৫ সালে ২৬ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়েছে। চলতি বছর বাগান থেকে এখন পর্যন্ত ১২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছি, আশা করি এবছর ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ফল বিক্রি করতে পারব।
বাগান তৈরিতে কী ধরনের সহযোগিতা পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার এক ভাগ্নে কৃষি অফিসার, তার থেকেই আমি পরামর্শ নিয়েছি। সে আমাকে জানানয়, অন্য ফলের তুলনায় ড্রাগন চাষে লাভের পরিমাণ বেশি। এটা শুনে আমি আগ্রহী হই। পরবর্তী বিভিন্ন এলাকার অভিজ্ঞ চাষিদের থেকে ড্রাগন গাছের চারা সংগ্রহ করে বাগানের কার্যক্রম শুরু করি। এক বছরের মধ্যেই ভালো টাকা লাভে বাগান থেকে ফল বিক্রি করেছি। ড্রাগন বাগানের সফলতার চিহ্ন হিসেবে লাভের টাকায় আমি একটি দোতলা বাড়িও নির্মাণ করেছি। বর্তমানে আমার দেখাদেখি এলাকার আরও অনেকেই ড্রাগন ফলের বাগান করতে আগ্রহী হয়েছেন। আমি তাদেরও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছি।

বাগান থেকে উৎপাদিত ড্রাগন ফল কোথায় কোথায় বিক্রি হয় জানতে চাইলে শিক্ষক উজ্জ্বল বলেন, আমার বাগানে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ঘুরতে এসেও ফল কিনে নিয়ে যায়। তবে বরগুনার বাজারে ফল বিক্রির পর চাহিদা পূরণ হলে বরিশাল এবং ঢাকায় বিক্রি করা হয়। কিছুদিন আগেও বরগুনায় ৩ টন এবং ঢাকায় ৫ টন ফল বিক্রি করেছি।
বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, বরগুনা জেলায় এ বছর ২০ হেক্টর জমিতে ড্রাগন চাষ হয়েছে। ড্রাগন ফল এ অঞ্চলে আগে ছিল না। বরগুনায় যারা প্রগতিশীল এবং অগ্রগামী কৃষক আছেন তারা ভিন্নধর্মী ফল চাষে উদ্যোগী হয়েই ড্রাগন ফল চাষকে বেছে নিয়েছেন। আমরা প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে ড্রাগন ফলের প্রদর্শনী করেছি। এ ফল চাষে কৃষকদের সুবিধা হচ্ছে তারা অন্য ফলের তুলনায় বাজার মূল্য বেশি পায়। আগে বাইরের জেলা থেকে বরগুনায় ড্রাগন ফল আসতো কিন্তু এখন কৃষকরা বরগুনার চাহিদা পূরণ করে আশপাশের জেলায়ও সরবরাহ করছেন।
আগ্রহী কৃষকদের সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, ড্রাগন ফল চাষে আমরা কৃষকদেরকে কারিগরি পরামর্শসহ যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করছি। পাশাপাশি আমাদের কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে প্রদর্শনী করে কৃষকদের ড্রাগন গাছের চারা সার এবং কীটনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণ প্রদান করছি। এছাড়া মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে যাতে অনেকে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয়।
শিক্ষক উজ্জ্বলের বিষয়ে তিনি বলেন, উনি একজন শিক্ষক। পাশাপাশি আমাদের কৃষিতে একজন আইকন। তার দেখাদেখি আরও কৃষক ড্রাগন চাষে আগ্রহী হচ্ছেন এবং ওই এলাকায় ড্রাগন চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে। শিক্ষক উজ্জ্বলকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে যতটুকু সহযোগিতা করা যায় তা আমরা করব। তার যদি কারিগরি সহযোগিতার প্রয়োজন হয় এবং মার্কেটিং করতে কোনো সমস্যা হয়, আমাদেরকে জানালে আমরা তার সে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।
আরকে
