বিজ্ঞাপন

উৎপাদন বাড়লেও কমছে লাভ, দুধের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারিরা

উৎপাদন বাড়লেও কমছে লাভ, দুধের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারিরা

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে শুরু হয় ব্যস্ততা। কেউ গরুর খাবার প্রস্তুত করছেন, কেউ দুধ দোহনে ব্যস্ত। দেশের অন্যতম দুগ্ধসমৃদ্ধ এই জনপদে প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হলেও খামারিদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি নেই।

গবাদিপশুর খাদ্য, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে গেলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি দুধের দাম। ফলে উৎপাদন বাড়লেও কমছে লাভ। এতে বাড়ছে খামারিদের দুশ্চিন্তা।

দেশের অন্যতম দুগ্ধ উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত শাহজাদপুর। এখানকার হাজারো পরিবার গবাদিপশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগে রয়েছেন খামারিরা। 

তাদের অভিযোগ, গোখাদ্য থেকে শুরু করে ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ দুধের দাম প্রায় আগের জায়গাতেই আটকে আছে।

জানা গেছে, মিল্কভিটা এখনো প্রতি লিটার দুধ ৪৫ থেকে ৪৭ টাকায় সংগ্রহ করে। খোলা বাজারে বিক্রি করলে ৫৫ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় এই দামও পর্যাপ্ত নয়। পাঁচ বছর আগে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল প্রায় ৪০০ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। আবার একই সময়ে ভুসি, খৈল, ভুট্টা, মাসকলাই, মসুরসহ বিভিন্ন ধরনের পশুখাদ্যের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু দুধের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি।

দখলবাড়ী এলাকার খামারি মিন্টু অভিযোগ করে বলেন, আগে মিল্কভিটার পক্ষ থেকে বছরে বোনাস, কৃষিঋণসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাওয়া যেত। এখন সেসব সুযোগ-সুবিধাও অনেক কমে গেছে। এ কারণে বর্তমানে মিল্কভিটায় দুধ সরবরাহ করছি না।

একই ধরনের অভিযোগ করেন খামারি মুকুল মোল্লা। তিনি বলেন, গবাদিপশুর খাদ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, সে তুলনায় দুধের দাম বাড়েনি। আমরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।

শুধু মিন্টু বা মুকুল নন, গো-চারণভূমি এলাকার আরও অনেক খামারি একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে অনেকেই খামার পরিচালনা করতে হিমশিম খাবেন, কেউ কেউ হয়তো এই পেশাই ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।

খামারিদের দাবি, শুধু দুধের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেই হবে না, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুধের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গোখাদ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। তা না হলে দেশের অন্যতম দুগ্ধসমৃদ্ধ এই জনপদের অনেক খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

শাহজাদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার খামার রয়েছে। চরাঞ্চলের ৩২টি বাথানে প্রায় ৩ হাজার গবাদিপশু পালন করা হয়। এসব বাথান ও খামারে রয়েছে প্রায় এক হাজার ২০০ দুধেল গাভি এবং এক হাজার ৮০০ ষাঁড় ও বকনা গরু। উপজেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। একটি দুধেল গাভি গড়ে আট থেকে দশ লিটার দুধ দেয়।

শাহজাদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বেলাল হোসেন বলেন, উন্নত জাতের বীজ দিয়ে কৃত্রিম প্রজনন, খামারিদের প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন রোগের টিকাদান, কৃমিনাশক ওষুধ বিতরণ এবং বিনামূল্যে ক্ষুরা ও তড়কা রোগের টিকা প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খামারিদের সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

খামারিদের সুযোগ-সুবিধা কমানোর বিষয়ে মিল্কভিটার চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিলকে ফোন করলে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ফোনটি ধরেন। তিনি ব্যস্ত থাকায় বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

নাজমুল হাসান/আরএআর