গাইবান্ধায় আবারও বাড়ছে তিস্তার পানি। গেল সোমবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ সেন্টিমিটার পানি কমে বিপৎসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও, আজ সকাল থেকে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ১২ ঘণ্টায় ১১ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে, বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরবর্তীতে, আজ সকাল ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৯ ঘণ্টায় তা আরও ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তিস্তায় পানি হ্রাস-বৃদ্ধির এই দোলাচলে নিম্নাঞ্চলের পাট, আউশ, তিল, আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির প্রায় ৯০০ বিঘা জমি ফসলের ক্ষেত পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। এর ফলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্প মেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ড।
গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টা থেকে আজ বুধবার বেলা ৩টা পর্যন্ত গেল ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমা ১৪২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর পানি চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ১২৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধিতে বিপৎসীমার ২২৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে, চলমান বন্যার মওসুমে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
গাইবান্ধার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্ষার চলমান মওসুমে নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির প্রভাবে দুই উপজেলার ৮৮৬.৫ বিঘা জমির ফসল পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে পাট ৩০ হেক্টর, আউশ ৪৫ হেক্টর, তিল ২৫ হেক্টর, শাকসবজি ১০ হেক্টর ও আমন বীজতলা ৮.০২ হেক্টর।
গাইবান্ধার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, চলমান মৌসুমে নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে সুন্দরগঞ্জ ও গোবিন্দগঞ্জে নিম্নাঞ্চলের ১১৮ হেক্টর বিভিন্ন ফসলি জমি পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। যার সিংহভাগই সুন্দরগঞ্জে। তিনি জানান, দ্রুত পানি নেমে গেলে আক্রান্ত জমির ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, গতকাল তিস্তার পানি কমলেও আজ আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি সপ্তাহের শেষে এবং আগামী সপ্তাহের শুরুতে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে স্বল্প মেয়াদি বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত জেলায় বড় বন্যার আশঙ্কা নেই।

এসময় তিনি আরও বলেন, পানি বৃদ্ধি-কমার মধ্যে জেলার নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলে ২০ থেকে ২৫টি স্পটে ভাঙন শুরু হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভাঙনকবলিত ওইসব এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সম্প্রতি উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধির প্রভাবে সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সাদুল্লাপুর উপজেলায় ভাঙনে নদী তীরবর্তী অন্তত আট শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছেন। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদী পাড়ের মানুষ। ভাঙন এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়তই নতুন করে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি। গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, চলমান পানি বৃদ্ধি শুরুর থেকে জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব এলাকার মধ্যে তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের চৌমহন চর, খাটিয়ামারি ও কাউয়াবাদা এলাকা। এছাড়া ভাঙনের শিকার হয়েছে একই উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট, রসুলপুর, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর এলাকা।
অপরদিকে, প্রবল ভাঙনের শিকার হয়েছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপসিয়া ইউনিয়নের ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লাল চামার ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কেরানীর চর এলাকা। এছাড়া কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালির খামার গ্রামের শখের বাজার, হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ী, রাঘব, চন্ডিপুর ইউনিয়নের উত্তর সীচা, কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, কেরানির চর, মিন্টু মিয়ার চর ও বাদামের চর এলাকাও ভাঙনের শিকার হয়েছে।
অন্যদিকে, ভাঙনে বসতভিটা হারিয়েছে সদর উপজেলার মোল্লার চরের সিধাইল এলাকা ও সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকাসহ সাদুল্লাপুরের ঘাঘট নদীর তীরবর্তী কয়েকটি এলাকা।
প্রসঙ্গত, গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, দুধকুমার নদী পাটেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) স্টেশনে বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।
এছাড়া আগামী ৩ জুলাই থেকে ৫ জুলাই ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলায় সতর্ক সীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে।
মাসুম বিল্লাহ/এসএইচএ
