বিজ্ঞাপন

নওগাঁয় ফ্রিল্যান্সারকে হাতকড়া পরিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, এএসআই বরখাস্ত

নওগাঁয় ফ্রিল্যান্সারকে হাতকড়া পরিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, এএসআই বরখাস্ত

নওগাঁয় এক ফ্রিল্যান্সারকে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে হাতকড়া পরিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনায় পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই)  জাকারিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম তাকে বরখাস্ত করেন। এর আগে গত ২২ জুন নওগাঁ সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের ইকরতাড়া গ্রামের ফ্রিল্যান্সার নাঈম হোসেনের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,  গত ২২ জুন আকস্মিক নাঈম হোসেনের বাড়িতে হাজির হন সদর মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জাকারিয়া। এরপরই শুরু হয় অভিযানের শ্বাসরুদ্ধকর এক নাটক। হাতকড়া পরানো হয় ফ্রিলান্সার নাঈমকে। অভিযোগ তোলা হয় মানি লন্ডারিংয়ের। ভীতিকর এমন পরিস্থিতে ফেলে নাঈমকে ছেড়ে দেওয়ার শর্তে একপর্যায়ে শুরু হয় দেনদরবার। নাঈমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে প্রায় এক লাখ টাকা সমমূল্যের ডলার সেন্ড করে নেওয়া হয় আরেক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে। বিনিময়ে আপাতত ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে। সদর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় মাসিক মোটা অঙ্কের চাঁদার টাকা। যা দিতে অক্ষম ছিলেন নাঈম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নওগাঁ সদর মডেল থানার এমন চাঁদাবাজির তথ্য জানান ফ্রিল্যান্সার নাঈমের এক ঘনিষ্ঠ বড় ভাই। তিনি জানান, সদর থানার বর্তমান ওসি আসাদুজ্জামান টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। টাকার নেশার উন্মাদনায় পড়ে এএসআই জাকারিয়াকে দিয়ে তিনি এই কাজ করিয়েছেন। পরে বিষয়টি পুলিশ সুপারের কানে গেলে ওসিকে সেইফ জোনে রেখে এএসআই জাকারিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর নওগাঁ সদর মডেল থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে যোগদান করেন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। এ থানার অধীনে রয়েছে ভীমপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র এবং শহরের কালিতলা পুলিশ ফাঁড়ি। আসাদুজ্জামান ওসি হিসেবে যোগদানের পর তার অধীনস্ত এ দুটি ইউনিটে উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে পুলিশ পরিচয়ে চাঁদাবাজি। মাদক ও জুয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।

যার ভুক্তভোগী হাঁসাইগাড়ী ইউনিয়নের ভীমপুর গ্রামের বাসিন্দা আতিকুর রহমান। তিনি জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক প্রতিবেশী আমার বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকির জিডি করেছিলেন। সেই জিডির তদন্তের ভার পেয়েছিল ভীমপুর তদন্ত কেন্দ্রের এএসআই চন্দন। একপর্যায়ে ওই এএসআই আমাকে ডেকে নগদ ২ হাজার টাকা ঘুষ নেন। পরে জিডির তদন্ত রিপোর্ট পক্ষে দিতে হলে ওসি আসাদুজ্জামান স্যারকে ৫ হাজার টাকা দিতে হবে বলে দাবি করেন। সেই টাকা না দেওয়ায় আমাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকির মধ্যে রেখেছেন। পরে শুনেছি তিনি আমাকে অভিযুক্ত করে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন।

শহরের হাঁট নওগাঁ মহল্লার বাসিন্দা ইশাতির রাদি বলেন, কালিতলা, হাট নওগাঁ এবং গোস্তহাটির মোড়ে মাদকের বড় বড় পয়েন্ট আছে। প্রকাশ্যে এসব এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলের কেনাবেচা হয়। কালিতলা পুলিশ ফাঁড়ির মাধ্যমে সদর থানা পুলিশ এসব পয়েন্ট থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেয়। কেউ মাসোহারা দিতে দেরি করলে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অথচ টাকা পেলে পুলিশ এসব দেখেও দেখে না।

সোনারতরী আইটি একাডেসি নওগাঁর ব্যবস্থ্যাপনা পরিচালক মাহাবুব আল হাসান সোহাগ একজন ফ্রিলান্সারকে এমন হয়রানির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ফ্রিলান্সারদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ তুলে ধরে হয়রানি করাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। নাঈমের সাথে যেটি ঘটেছে মোটেও ঠিক হয়নি। বর্তমান ওসি যোগদানের পর থেকে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠছে। আমরা চাই ‘শুধু অধস্তনকে নয়, জড়িত ঊর্ধ্বতনরাও শাস্তির আওতায় আসুক।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জাকারিয়ার মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি সাক্ষাতে কথা বলার অনুরোধ জানিয়ে কল কেটে দেন। পুনরায় কল করা হলে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ফ্রি হয়ে কল করবেন বলে জানান। তবে পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। একপর্যায়ে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

নওগাঁ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এএসআই জাকারিয়ার বিরুদ্ধে হাতকড়া পরিয়ে টাকা আদায়ের যে অভিযোগ উঠেছে ওইদিন আমি ছুটিতে ছিলাম। ভীমপুর তদন্ত কেন্দ্র ও কালিতলা পুলিশ ফাঁড়ির বিষয়ে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

সার্বিক বিষয়ে কথা হলে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, এএসআই জাকারিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরপরই তা খতিয়ে দেখা হয় এবং সত্যতা পাওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কালিতলা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকেও অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুই দিন আগে সরিয়ে দেওয়া হয়। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থ্যা নেওয়া হবে।

মনিরুল ইসলাম শামীম/আরএআর

বিজ্ঞাপন