জীবনের শেষ বয়সে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে রাস্তার পাশে পলিথিন, ছেঁড়া ব্যানার ও খড়কুটো দিয়ে তৈরি একটি ঝুপড়ি ঘরে। নেই বিদ্যুৎ, নেই নিরাপদ আশ্রয়, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এমন মানবেতর জীবনযাপন করছেন নীলফামারী সদর উপজেলার কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের বাড়ো ঘড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব লুৎফর রহমান চৌধুরি।
জানা যায়, লুৎফর রহমান চৌধুরি সদর উপজেলার কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের মৃত ছলি মামুদ চৌধুরীর ছেলে। এক সময়ে তিনি রিকশা ও ভ্যান চালিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার চালাতেন। এরপর ধীরে ধীরে পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বৃদ্ধ হওয়ার পরে সন্তানেরা আর তার আর খোঁজ নেয় না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সদর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের নীলফামারী থেকে ডোমার মহাসড়ক-সংলগ্ন নটখানা এলাকায় রাস্তার পাশে একটি ওয়ালের সঙ্গে পলিথিন, ছেঁড়া ব্যানার ও খড়কুটো দিয়ে তৈরি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন তিনি। ঘড়টির চারপাশ ঝোপঝাড়ে ভরা। ভেতরে রয়েছে একটি জরাজীর্ণ বিছানা, যার চারদিকে ইঁদুরের গর্ত। বৃষ্টি, ঝড় কিংবা শীত- কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই সেখানে।

লুৎফর রহমান পেটের খিদের তাগিদে প্রতিদিন রাস্তাঘাট থেকে পলিথিন ও বিভিন্ন পরিত্যক্ত সামগ্রী সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো ভাঙরির দোকানে বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে দিন চলে তার। অনেক সময় মানুষের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে তার পেটের খাবার। তবে নিয়মিত খাবার না জোটায় অনেক সময়ে তাকে অনাহারে থাকতে হয়।
লুৎফর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগে রিকশা ভ্যান চালিয়ে স্ত্রী সন্তানকে খাওয়াতাম। আমি বৃদ্ধ হওয়ার পরে আমার ছেলেরা ঢাকা থাকেন। তারা খোঁজ খবর নেয় না। জীবনটা একেবারে বদলে গেছে। ভরণপোষণ তো দূরের কথা, আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি, সেটাও জানতে চায় না। গৃহহীন হয়ে অনেকদিন পথে পথে ঘুরেছি। পরে নটখানা কুষ্ঠ হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টারের একটি পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেখান থেকেও চলে যেতে হয়। এখন এই ঝুপড়িই আমার একমাত্র আশ্রয়।
স্থানীয় বাসিন্দা রহমত আলি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়লেও প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে বের হয় তিনি। শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও নিজের খাবারের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়।
মুদি দোকানি মনোয়ার হোসেন বলেন, বৃদ্ধ আমার দোকান থাকে একটু দূরে থাকেন, মাঝেমধ্যে দোকানে এসে খাবার চান। তিনি দীর্ঘসময় ধরে এখানে আছেন। সরকার তাকে একটা থাকার জায়গা করে দিলে তিনি ভালো থাকতেন।
আরেক বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা ঢাকা পোস্টকে বলেন, লুৎফর রহমানের জীবন সংগ্রাম আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো একটি ঘটনা। একজন বৃদ্ধ মানুষ জীবনের শেষ বয়সে পরিবার ও সমাজের অবহেলায় রাস্তার পাশে পলিথিনের ঝুপড়িতে বসবাস করেন। তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, জেলা প্রশাসক স্যারের সহায়তায় বৃদ্ধকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা হয়েছিল। পরে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন, আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
শাহজাহান ইসলাম লেলিন/এএমকে
