কুড়িগ্রামে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাড়ির ছাদ, উঠান ও পুকুরে স্বল্প খরচে মাছ উৎপাদন করে একদিকে যেমন পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে অতিরিক্ত আয় ও আর্থিক স্বচ্ছলতা।
সরেজমিনে রাজারহাট উপজেলার বোতলারপাড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মৎস্যচাষি উমর ফারুক তার প্রায় দুই একর আয়তনের পুকুরে অটোমেটেড ফিশ ফিডার মেশিন স্থাপন করেছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় জেলার বিভিন্ন পুকুরে এয়ারেটর, অটোমেটেড ফিশ ফিডার ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
চাষিরা জানান, এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মাছের খাবারের অপচয় কমছে, সময় ও শ্রম সাশ্রয় হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে এয়ারেটরের মাধ্যমে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকায় তীব্র গরমেও মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব উপায়ে মাছ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিক মুনাফার আশায় অনেক চাষি মাছের খামারে অতিরিক্ত রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আধুনিক পুকুর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুকুরের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রেখে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি খামারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুকুরে সিসি ক্যামেরাও স্থাপন করা হচ্ছে।
নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে আরডিআরএস ও পিকেএসএফের সহায়তায় পরিত্যক্ত উঠান ও বাড়ির ছাদে ট্যাংকে মাছ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রথমবারের মতো অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষও শুরু হয়েছে।
বর্তমানে রাজারহাট উপজেলায় অন্তত পাঁচটি বাড়ির ছাদ ও উঠানে স্থাপিত অস্থায়ী ট্যাংকে গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার করে ভিয়েতনামি কই, ট্যাংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। এতে পরিবারের মাছের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।
এ প্রযুক্তি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে মাঠ দিবস ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
মাছচাষি উমর ফারুক বলেন, প্রথমবারের মতো অটোমোটেড ফিশ ফিডার মেশিন স্থাপন করেছি। প্রায় ৪৫ হাজার টাকার এই মেশিনে ১২০ কেজি খাবার ধারণ ক্ষমতা। এখানে মোবাইলের অ্যাপসের মাধ্যমে সময় ঠিক করে রাখা যায়। নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী অটোমেটিক ভাবে পুকুর খাবার পড়তে থাকে। বিদ্যুৎ না থাকলেও সোলার দিয়েও এই মেশিন চালানো যায়। এতে করে মাছের খাবার অপচয় রোধসহ শ্রমিক সংকটের কারণে মাছের খাবার দিতে ব্যাহত হয় সেই ঝামেলা আর নেই। ফলে সময়, অর্থ ব্যয় কমেছে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা তীব্র তাপমাত্রায় মাছের খাবার দেওয়ার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেয়েছি। পুকুরের পাশেই সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এতে করে মাছের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হচ্ছে।

আরডিআরএস বাংলাদেশ মৎস্য টেকনিক্যাল অফিসার মোজাম্মেল হক বলেন, আরডিআরএস ও পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন এভাবেই দারিদ্র পীড়িত জেলার মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ, মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বাড়ার লক্ষ্যে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে কাজ করছে।
রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, উপজেলার বিভিন্ন পুকুরে প্রথমবারের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছ উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে করে মৎস্যজীবীদের সময়, অর্থ এবং ভোগান্তি কমে আসবে। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও এ প্রযুক্তি ভূমিকা রাখছে।
মমিনুল ইসলাম/আরকে
