মাঝ আষাঢ়েও রাজশাহীতে বৃষ্টির দাপট সেই অর্থে নেই। মাঝেমধ্যে আকাশে মেঘের ভেলা ভাসলেও তা বৃষ্টি নামাতে পারেনি। বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা না হলেও এর মধ্যে নগরীতে ডেঙ্গুবাহক এডিস মশার উপদ্রব বেড়েছে। হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছেন নতুন ডেঙ্গু রোগী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রাক-বর্ষা কীটতাত্ত্বিক জরিপে উঠে এসেছে, নগরীতে এডিস মশার ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত ঝুঁকিমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দুইজন ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও চারজন ডেঙ্গু রোগী।
রামেক হাসপাতালের দেওয়া তথ্য মতে, জুন মাসের শেষ ২০ দিন ও জুলাই মাসের প্রথম দুই দিনে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ২১ জন। এই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর না থাকলেও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ১৮ মাস বয়সী এক শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ জুন একজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই দিন হাসপাতালটিতে আরও দুইজন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১০ জুন থেকে ১২ জুন নতুন ডেঙ্গু রোগী না থাকলেও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন দুইজন। এ ছাড়াও ১৩ ও ২৪ জুন একজন রোগী ভর্তি হন। ১৫, ১৬ ও ১৭ জুন নতুন রোগী ভর্তি না হলেও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন দুইজন। ১৮ ও ১৯ জুন রোগী ভর্তি না হলেও ২০ জুন একজন ভর্তি হন। ২১ জুন রোগী ভর্তি না হলেও ২২ জুন একজন নতুন রোগী ভর্তি হন। পরের দিন ২৩ জুন তিনজন এবং ২৪ জুন দুইজন ভর্তি হয়েছেন। এতে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচজনে।
২৫ জুন দুইজন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হলেও ছাড়া পেয়েছেন দুইজন। ২৪ জুন ভর্তি না থাকলেও ২৭ জুন একজন ভর্তি হয়েছেন। এদিন একজন ছুটি পেয়েছেন। ২৮ জুন নতুন রোগী না থাকলেও ২৯ জুন একজন ভর্তি হন। এদিন ছুটি হয় দুইজনের। ৩০ জুন নতুন করে তিনজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন এবং চিকিৎসাধীন থাকেন তিনজন। ১ জুলাই নতুন একজন রোগী ভর্তি হলেও ছাড়া পেয়েছেন দুইজন, চিকিৎসাধীন থাকেন দুইজন। সবশেষ ২ জুলাই নতুন করে দুইজন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চারজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন রামেক হাসপাতালে।
বিষয়টি নিয়ে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকরকে বিশ্বাসের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। তাই এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত মে মাসে পরিচালিত জরিপে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) এলাকায় ব্রেটো ইনডেক্স (বিআই) পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৬৬। ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুযায়ী, এই সূচক ২০ বেশি হলে সংশ্লিষ্ট এলাকাকে ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জরিপে নগরীর ৭৫টি বাড়ির ১৫টিতেই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ফলে হাউস ইনডেক্স দাঁড়িয়েছে বিশ শতাংশ। একই সঙ্গে পরীক্ষা করা ৫২টি পানিধারণকারী পাত্রের মধ্যে ২৩টিতে লার্ভা শনাক্ত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি পাঁচটি বাড়ির একটিতে এবং প্রায় অর্ধেক পানিধারণকারী পাত্রে লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বর্ষার বৃষ্টিতে এসব স্থানে আরও পানি জমলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের এন্টো-টেকনিশিয়ান আব্দুল বারী বলেন, নিয়মিত প্রাক-বর্ষা নজরদারির অংশ হিসেবে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নগরীতে লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক এডিস মশার উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
রাজশাহী জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা জানান, এডিস মশা এখন শুধু প্রচলিত পানির উৎসে নয়, মানুষের অসচেতনতার কারণেও বংশবিস্তার করছে। জরিপে ফুলের টব, ছাদবাগান, খোলা নারকেলের খোসা, দইয়ের পাত্র, শিশুদের খেলনা, পরিত্যক্ত টায়ারসহ নানা ধরনের পানিধারণকারী সামগ্রীতে লার্ভা পাওয়া গেছে।
রাসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন জানান, বর্ষা সামনে রেখে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা, নালা-নর্দমা পরিষ্কার এবং মশা নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলছে।
শাহিনুল আশিক/আরএআর
