প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় কৃষকদের মাঝে গাছের চারা, জৈব সার ও বাঁশের খুঁটি বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগী কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় অনেক কম জৈব সার বিতরণ করা হয়েছে। নিম্নমানের বাঁশের খুঁটি সরবরাহ করা হয়েছে এবং প্রকৃত প্রাপ্তির চেয়ে বেশি পরিমাণ উপকরণ গ্রহণের স্বীকারোক্তিতে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে কৃষি বিভাগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার এক হাজার ২০০ কৃষককে এ প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেক কৃষকের পাওয়ার কথা পাঁচটি গাছের চারা, পাঁচটি বাঁশের খুঁটি এবং ১৫০ কেজি জৈব সার (গোবর)। সরকারি বরাদ্দপত্রে প্রতিটি গাছের চারার মূল্য ১৬০ টাকা, প্রতিটি বাঁশের খুঁটির মূল্য ৫০ টাকা এবং প্রতি কেজি জৈব সারের মূল্য ৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া পরিবহন ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্যও পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কিন্তু গত সোমবার (২৯ জুন) উপকরণ বিতরণের সময় দেখা যায়, ১৫০ কেজি জৈব সারের পরিবর্তে কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৪০ কেজি সার। অভিযোগ রয়েছে, একই সঙ্গে ১৫০ কেজি সার গ্রহণ করেছেন মর্মে কৃষকদের কাছ থেকে স্বাক্ষর বা টিপসই নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পে সরবরাহ করা বাঁশের খুঁটির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি হিসাবে প্রতিটি খুঁটির মূল্য ৫০ টাকা ধরা হলেও কৃষকদের দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের বাঁশের কঞ্চি। স্থানীয় বাঁশ ব্যবসায়ী আশারুল ইসলাম খুঁটি পরীক্ষা করে বলেন, এসব খুঁটির মান খুবই নিম্নমানের এবং স্থানীয় বাজারে এর মূল্য ১০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কৃষক বলেন, সরকারি পত্রে স্পষ্টভাবে ১৫০ কেজি গোবর সারের কথা উল্লেখ থাকলেও তারা পেয়েছেন মাত্র ৪০ কেজি। তাদের প্রশ্ন, সরকারি নির্দেশনায় গোবর সারের কথা উল্লেখ থাকার পরও কার অনুমতিতে কোম্পানির বস্তাজাত সার দেওয়া হলো এবং কেন নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে ১১০ কেজি কম সার বিতরণ করা হলো।
মাঠে দায়িত্ব পালনকারী উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তন্ময় মণ্ডলের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। তিনি শুধু বলেন, একটু সমস্যা আছে। স্যারদের সঙ্গে কথা বলেন।
অভিযোগের বিষয়ে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ শুভ্র বলেন, অভিযোগগুলো সঠিক নয়। ১৫০ কেজি গোবর সারের পরিবর্তে কৃষকদের ৬০০ টাকা মূল্যের প্রায় ৪০ কেজি কোম্পানির জৈব সার দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. জামালউদ্দীন বলেন, সরবরাহ করা বাঁশের খুঁটির মান সন্তোষজনক নয় এবং এর বাজারমূল্য সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক কম।
সরকারি বরাদ্দপত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার এক হাজার ২০০ কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত জৈব সার ও বাঁশের খুঁটির মূল্য এবং বাস্তবে বিতরণ করা উপকরণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ব্যবধান রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, শুধু এ দুটি খাতেই প্রায় ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকার আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সমগ্র সাতক্ষীরা জেলায় এ প্রকল্পের আওতায় ৪৮ হাজার ৬০০ জন কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সদর উপজেলার মতো একই ধরনের অনিয়ম অন্য উপজেলাগুলোতেও হয়ে থাকলে সম্ভাব্য আর্থিক অসঙ্গতির পরিমাণ আরও বড় হতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এ ঘটনায় সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সাতক্ষীরার সভাপতি মো. তৈয়েব হাসান সামছুজ্জামান বলেন, সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কৃষি বিভাগের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইব্রাহিম খলিল/এসএইচএ
