জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মাগুরায় তিন দিনব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। আয়োজনে ছিল আলোচনা সভা, নজরুলসংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা। তবে এতে দর্শক উপস্থিতি ছিল প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। এ নিয়ে স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
গত বুধবার (১ জুলাই) জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে জেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন (পিপিএম-সেবা), সিভিল সার্জন ডা. মো. শামীম কবির এবং সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. আলফাজ উদ্দিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ইমতিয়াজ হোসেন।
অডিটোরিয়ামের অধিকাংশ আসনে ছিলেন নার্সিং ইনস্টিটিউট ও বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণার্থী ও শিক্ষার্থীরা। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে তাদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। তবে জেলার স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ দর্শকদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত।
এনিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, জেলায় যেখানে অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে, সেখানে জাতীয় পর্যায়ের এমন গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনেও কেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অংশগ্রহণ এত কম?
জেলা কালচারাল অফিসার পার্থ প্রতিম দাস সাংবাদিকদের জানান, সারাদেশের মতো মাগুরাতেও ‘নজরুল বর্ষ’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতি, মোবাইলনির্ভর বিনোদন ও প্রযুক্তির প্রভাব মানুষের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলছে। তবে জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে প্রচার-প্রচারণায় কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি।
তার ভাষ্য, জেলার প্রায় ৫০টি সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত ৩২টিসহ সব সংগঠনকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে এবং লিখিতভাবে অনুষ্ঠানের বিষয়ে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এরপরও প্রত্যাশিত সংখ্যক দর্শক উপস্থিত হননি।
পার্থ প্রতিম দাস বলেন, আমরা অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারি, সবাইকে জানাতে পারি। কিন্তু ঘর থেকে বের হয়ে অনুষ্ঠানে আসার মানসিকতা একজন সংস্কৃতিসেবীকেই তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনুষ্ঠানের মান আরও উন্নত করার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। তবে দর্শকদেরও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংস্কৃতিচর্চা গড়ে তুলতেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠানে আনা হয়েছে।
তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মীর মতে, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় সংস্কৃতিমনা মানুষ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আয়োজনটি আরও প্রাণবন্ত হতে পারত।
শাহনেওয়াজ নামে একজন সমাজসেবক বলেন, জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকীর মতো রাষ্ট্রীয় আয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এই আয়োজনকে মানুষের উৎসবে পরিণত করতে হবে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন, অনুদানপ্রাপ্ত শিল্পী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ—সবাইকে সম্পৃক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আগামীতে পরিকল্পিত প্রচারণা, সময়োপযোগী আয়োজন এবং অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সম্প্রতি জেলা পর্যায়ে প্রায় ৮০ জন শিল্পীকে সরকারি অনুদানের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া জেলার ৩২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়মিত সরকারি অনুদান পাচ্ছে। কিন্তু জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজনে সেই শিল্পী ও সংগঠনগুলোর বড় অংশের দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল না বলে মন্তব্য করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই।
এ বিষয়ে জেলা কালচারাল অফিসার পার্থ প্রতিম দাস সাংবাদিকদের বলেন, অনুদানপ্রাপ্ত সংগঠনগুলোর আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ অবশ্যই প্রত্যাশিত। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় তাদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু সব সংগঠন থেকে প্রত্যাশিত উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ভবিষ্যতে মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের একাংশ মনে করেন, দর্শক সংকটের পেছনে কেবল মানুষের অনাগ্রহ নয়; প্রচার-প্রচারণার কার্যকারিতা, অনুষ্ঠান আয়োজনের ধরন, সময় নির্বাচন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত শিল্পী ও সংগঠনগুলোর নিয়মিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে জেলার সাংস্কৃতিক পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
তিন দিনব্যাপী উদ্বোধনী কর্মসূচি শেষে বছরজুড়ে বিভিন্ন কর্মশালা, সেমিনার, নাটক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের পরিকল্পনা রয়েছে জেলা শিল্পকলা একাডেমির। সংশ্লিষ্টদের আশা, আগামী আয়োজনগুলোতে স্থানীয় দর্শক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং অনুদানপ্রাপ্ত শিল্পীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
তাছিন জামান/এসএইচএ
