‘রিকশা না চালালে খাবো কী। আমি গরিব মানুষ, এটার আয়ে সংসার চলে। কিন্তু এই গরমে রিকশা নিয়ে রাস্তায় থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে। গলা শুকিয়ে বারবার পিপাসা অনুভূত হচ্ছে। সকাল থেকে অন্তত ১০ গ্লাস পানি পান করেছি। তবুও তৃষ্ণা মিটছে না।’ কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব বয়সী সাইফুল ইসলাম।
রোববার (৫ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে নগরীর শাপলা চত্বরে কথা হয় এই রিকশাচালকের সাথে। বছর দশক আগে পা দিয়ে প্যাডেল চেপে রিকশা চালালেও এখন তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক।
গত দুদিন ধরে মৃদু তাপপ্রবাহে সাইফুল ইসলামের মতো ভোগান্তিতে পড়েছে হাজারো খেটে খাওয়া মানুষ। বর্ষাকালে এমন অসহনীয় তাপপ্রবাহে হাঁসফাঁস করছে পুরো রংপুর অঞ্চল। জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামলেও প্রচণ্ড গরমে কাহিল হয়ে পড়ছেন দিনমজুররা।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, রোববার (৫ জুলাই) বিকেল ৩টায় রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি, নীলফামারীতে ৩৫ ডিগ্রি, সৈয়দপুরে ৩৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩৪ ডিগ্রি, লালমনিরহাটে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি, গাইবান্ধায় ৩৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৪ ডিগ্রি এবং দিনাজপুরে ৩৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
এর আগের দিন শনিবার (৪ জুলাই) বিকেল ৩টায় রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি, সৈয়দপুরে সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি, নীলফামারীতে ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি, লালমনিরহাটে ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি, গাইবান্ধায় ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি এবং দিনাজপুরে ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এসব জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
এই মৃদু তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। সাইফুলের মতো রিকশাচালক জহুরুল হক বলেন, ‘পেটের দায়ে রিকশা ধরি বাইর হইলেও গরমে হামাক কাহিল করি ফেলাইচে। এত রইদোত কি রিকশা চলা যায়! বর্ষাকালোত ঝড়বৃষ্টি হবার কথা। কিন্তু কয়দিন হয়্যা আর নাই। এ্যালা রোইদোতে হামার অবস্থা খারাপ।’
রংপুর মহানগর ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দুপুরের রোদে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। নগরের বিভিন্ন স্থানে রিকশাচালকদের গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে। খোলা আকাশের নিচে কাজ করা কৃষি ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
জরুরি কাজে পীরগাছা উপজেলার কান্দি বাজার থেকে মোটরসাইকেলে করে রংপুর নগরীতে এসেছেন স্কুলশিক্ষক আমিরুল ইসলাম। রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে তার সাথে কথা হলে এই স্কুলশিক্ষক জানান, এ রকম রোদে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া উচিত নয়। গ্রাম থেকে শহরে আসার পথে তিনি বেশ কয়েকবার পথিমধ্যে থেকে হোটেলে পানি পান করেছেন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান আবহাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বেশি করে পানি পান, হালকা খাবার গ্রহণ এবং প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়ার পরামর্শ তার।
অন্যদিকে তাপপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ। ফলে নগরীতে বেড়েছে হাতপাখা ও ছাতার চাহিদা। ফুটপাতে তালপাখা, বাঁশ, কাপড় ও সুতা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের হাতপাখা বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় গরমের কষ্ট আরও বেড়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। পাশাপাশি নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীদেরও পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।
নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) সূত্রে জানা গেছে, বিভাগে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ৮৫০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে রংপুর অঞ্চলের আবহাওয়ার চিত্র ক্রমেই বদলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদী সংগঠকরা। দুপুরের দিকে রংপুর নগরীর বিভিন্ন সড়কে মানুষের চলাচলও ছিল তুলনামূলক কম। প্রচণ্ড গরম এড়িয়ে অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না।
এদিকে আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন মৌসুমি রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, দুই দিন ধরে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৩ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসতে পারে এবং মানুষ স্বস্তি পেতে পারেন।
তিনি আরও জানান, রংপুরে এবার জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে রুক্ষ প্রকৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত কয়েক বছর থেকে এপ্রিল, মে ও জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। জুন মাসে স্বভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ছিল ৪৫০ মিলিমিটার। সেখানে বৃষ্টি হয়েছে ৩২৩ মিলিমিটার।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর
