বিজ্ঞাপন

৪ বছর ধরে বিদ্যুৎহীন ভোলার এক ইউনিয়নের ২০ হাজার মানুষ

৪ বছর ধরে বিদ্যুৎহীন ভোলার এক ইউনিয়নের ২০ হাজার মানুষ

মাটিতে পোঁতা রয়েছে শতশত বৈদ্যুতিক খুঁটি। খুঁটিতে টানা রয়েছে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে বৈদ্যুতিক কেবল, কিন্তু তারপরও গত চার বছর ধরে বিদ্যুতের সংযোগ নেই শস্যভান্ডার খ্যাত ভোলার দৌলতখান উপজেলার বিচ্ছিন্ন মদনপুর ইউনিয়নে। এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে সেখানকার প্রায় ২০ হাজার বাসিন্দার জীবনমান ও ব্যবসা-বাণিজ্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত চার বছর ধরে মেঘনা নদীর তলদেশে ছিঁড়ে থাকা সাবমেরিন কেবলটি মেরামত করে পুনরায় মদনপুরের বিদ্যুৎ সংযোগের দাবি জানালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

সরেজমিনে জানা যায়, মেঘনা নদীবেষ্টিত এ ইউনিয়নটিতে ২০২১ সালের শুরুর দিকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সদর উপজেলার তুলাতুলি পয়েন্ট থেকে মেঘনা নদীর তলদেশ দিয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয় ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এতে বিদ্যুতের আলোয় নতুনভাবে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন মদনপুর ও পার্শ্ববর্তী কাচিয়া ইউনিয়নের মাঝেরচরের বাসিন্দারা। বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেন পৌনে আটশ গ্রাহক। কিন্তু মাত্র সাত মাসের মাথায় ২০২২ সালের ২৩ জুন সাবমেরিন কেবলটি মেঘনা নদীতে চলাচলকারী একটি অজ্ঞাত জাহাজের নোঙরের সঙ্গে লেগে ছিঁড়ে যায়, এতে ফের অন্ধকারে ডুবে যান ইউনিয়নবাসী। অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় টিভি, ফ্রিজ, ফ্যান, বাতিসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক সামগ্রী অকেজো হয়ে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলে দাবি বাসিন্দাদের।

পুনরায় ইউনিয়নটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করার দাবিতে সম্প্রতি মদনপুর ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে পাটোয়ারী বাজারে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। এতে সভাপতিত্ব করেন ভোলা জেলা শ্রমিক পার্টির সভাপতি জামাল উদ্দিন।

ইউনিয়নটির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাত সন্তানের জননী নুরজাহান বেগম। তার তিন মেয়ে নুপুর, সিমা ও মীম স্কুলে পড়াশোনা করে। তবে স্কুল শেষে তারা বাড়ি ফেরার পর বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারে না। 

নুরজাহান বেগম বলেন, বিদ্যুতের অভাবে মেয়েরা স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার পর রাতে পড়াশোনা করতে পারে না। স্বপ্ন আছে। মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত বানানোর, কিন্তু বাড়িতে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে না পারলে তারা কীভাবে উচ্চশিক্ষিত হবে? তা ছাড়া মেয়েরা গরমের কারণে অস্থির থাকে।  একই আক্ষেপ তার প্রতিবেশী মো. জামাল উদ্দিনেরও।

পাটোয়ারী বাজার-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. আরিফ ও মনির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে আমাদের এই মদনপুর ইউনিয়নে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার পর খুব খুশি হয়েছিলাম আমরা। এরপর বৈদ্যুতিক মিটার নেওয়ার পর বাড়িতে টিভি, ফ্রিজসহ অন্যান্য ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বৈদ্যুতিক সামগ্রী কিনেছি। কিন্তু সাত মাসের মাথায় নদীতে সাবমেরিন কেবল ছিঁড়ে যাওয়ায় ফের আমরা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ি, কিন্তু চার বছরেও ছিঁড়ে যাওয়া কেবল মেরামত না করায় আস্তে আস্তে আমাদের সব বৈদ্যুতিক সামগ্রী অকেজো হয়ে পড়ে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পুরো মদনপুর ইউনিয়ন ও কাচিয়ার মাঝেরচরবাসী।

মো. রাকিব ও ইসমাইল নামে আরও দুই বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, আমরা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পর ধারদেনা করে পল্লী বিদ্যুতের মিটার নামিয়েছি এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সামগ্রী কিনে দেনাগ্রস্ত হয়েছি, যা এখনো পরিশোধ করতে পারিনি, অথচ এখন বিদ্যুৎই নেই। কিন্তু কর্তৃপক্ষ পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না।

ইউনিয়নটি ভোলার শস্যভান্ডার হলেও এখানকার উৎপাদিত সবজি ও অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না, ফলে এসব নষ্ট হয়ে প্রতিদিনই আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলে জানান ইউনিয়নটির বাসিন্দা ও ভোলা জেলা শ্রমিক পার্টির সভাপতি জামাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিকভাবে আমরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। এখানে কোটি কোটি টাকার কৃষিপণ্য উৎপাদন হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে আমরা কেউই নিরাপদ নই। পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ব্যাপারে পল্লী বিদ্যুতের এক আশ্বাসে চার বছর পেরিয়ে গেছে।

ইউপি সদস্য আব্দুল খালেক বলেন, মদনপুর ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আর কোনো মিথ্যা আশ্বাস মানতে রাজি নই। বারবার দাবি জানানো হলেও তারা শুধু আমাদের আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছে। আমাদের মদনপুর ইউনিয়নে অতিদ্রুত পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগের দাবি মানা না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাব।

পুনরায় সাবমেরিন কেবলটি সচল করার জন্য বরাদ্দ ও অর্থের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শাহ মো. রাজ্জাকুর রহমান।

তিনি বলেন, মেঘনা নদীর তলদেশে থাকা মদনপুর ইউনিয়নের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সাবমেরিন কেবলটি ছিঁড়ে থাকার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এদিকে অতিদ্রুত ইউনিয়নটিতে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

খাইরুল ইসলাম/আরএআর