ফরিদপুরে ভাঙনের কবলে পড়ে পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি। তীব্র ভাঙনে ইতোমধ্যে অন্তত আট একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মসজিদ। গত দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এ ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নে ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গীর উত্তর-পশ্চিমে কবির মোল্লার বাড়ি থেকে দক্ষিণে মৃধাডাঙ্গী এলাকার আলেপ খাঁর বাড়ি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে এ ভাঙন চলছে। ভাঙনের মুখে বসতভিটা সরিয়ে নিচ্ছেন এলাকাবাসী। ফসলি জমি ভাঙতে শুরু করায় অপরিপক্ব ফসল কেটে ফেলা হচ্ছে।
ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে অন্তত একশ মিটার দূরে অবস্থিত তিনটি স্থাপনা—চর টেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর টেপুরা কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গী জামে মসজিদ—ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।

ওই এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাঙনের মুখে কৃষক শাহাবুদ্দিন শেখ তার পাকা ভিতের বাড়ি ভেঙে সরিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া ভাঙনের কবলে পড়ে ওই এলাকার চার কৃষকের অন্তত আট একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ওই জমিতে পাট, তিল ও ইরি ধান রোপণ করা হয়েছিল।
এর মধ্যে কবির মোল্লার (৬৫) চার একর, ইউসুফ শেখের (৫০) ১৬৫ শতাংশ, আলী মণ্ডলের (৬০) ১৩২ শতাংশ এবং রাকিব মোল্লার ৩৩ শতাংশ ফসলি জমি ইতোমধ্যে পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
ওই এলাকার ইউপি সদস্য ইয়াকুব মৃধা বলেন, গত শুক্রবার থেকে এ এলাকায় পদ্মা নদীর ভাঙন শুরু হয়। এ ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এলাকাবাসী বসতবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন, পদ্মায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি। এ ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা চর টেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুকান্ত ঘোষ বলেন, ১৯৩৭ সালে স্থাপিত এই বিদ্যালয়টি তিন দফা ভাঙনের শিকার হয়ে বর্তমান জায়গায় ২৫ শতাংশ জমির ওপর রয়েছে। এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আছে ১৯৩ জন এবং শিক্ষক পাঁচজন। তিনি বলেন, এ ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে এ বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

ওই এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম শেখ (৫০) অভিযোগ করে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গীসংলগ্ন পদ্মা নদীর এ অংশ নাব্য রাখার জন্য বিআইডব্লিউটিসির উদ্যোগে খনন (ড্রেজিং) কাজ করা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে খনন কাজ করায় এ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।
এ খননকাজে নিয়োজিত বিআইডব্লিউটিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমান বলেন, যদি এলাকাবাসী মনে করে আমাদের খননকাজের জন্য নদীভাঙন দেখা দিয়েছে এবং আমরা যদি এ অভিযোগের বাস্তবতা পাই, তাহলে ওই চ্যানেলে খননকাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
নর্থ চ্যানেল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোস্তাকুজ্জামান বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল ঘুরে গেছেন। তারা জানিয়েছেন, তারাতাড়ি ভাঙন রোধে কাজ শুরু করবেন।
এই সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, দ্রুত ভাঙনরোধে কাজ শুরু করা না হলে ওই এলাকাকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচানো যাবে না।
ফরিদপুর সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা তিনি সরেজমিনে দেখে এসেছেন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসককে অবহিত করেছেন। জেলা প্রশাসক ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনুরোধ করেছেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, প্রতি বর্ষায় এ ভাঙন দেখা দেয়। এ ভাঙনের স্থায়ী সমাধানে নদীর পাড়ের তিন কিলোমিটার অংশে ব্লক স্থাপন করা হবে। তবে সেটি সময়সাপেক্ষ। আপাতত অস্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কাজ করা হবে।
জহির হোসেন/এসএইচএ
