ব্রহ্মপুত্রে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন। ফুলছড়িসহ অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ভাঙনকবলিত মানুষের অভিযোগ, প্রশাসনের আশ্বাস মিললেও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা এখনও দৃশ্যমান নয়।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১০২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে ঘাঘট নদীর পানি নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৫৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তবে জেলার কোনো নদ-নদীর পানিই এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
সরেজমিনে শনিবার বিকেলে ফুলছড়ি উপজেলার দক্ষিণ রসুলপুর (খলাই হারা) গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙনে নদীঘেঁষা বসতভিটা, গাছপালা, বাঁশঝাড় ও আবাদি জমিতে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে জমি। অনেকেই গাছ কেটে এবং ঘরবাড়ি সরিয়ে যা সম্ভব রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। কেউ ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে নিচ্ছেন, আবার কেউ জানেন না পরবর্তী আশ্রয় কোথায় হবে।
ফুলছড়ি উপজেলার দক্ষিণ রসুলপুর এলাকাসহ জেলার অন্তত আরও ১০টি পয়েন্টে নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ভাঙনে মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা ও ফসলি জমি। ভাঙনের খবরে জেলার সংশ্লিষ্ট ও শীর্ষ কর্তারা পরিদর্শনে গেলেও কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকছে তাদের উদ্যোগ। ফলে চাপা ক্ষোভ, আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটছে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের।

দক্ষিণ রসুলপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গত ১০ থেকে ১২ দিনে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। চোখের সামনে তাদের সব শেষ হচ্ছে। প্রথম দিকে আবাদি জমি ভাঙলেও এখন বসতভিটা, বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ও বাঁশঝাড়ও নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক সাহেব উদ্দিন জানান, ১০ থেকে ১৫ দিনের থেমে থেমে ভাঙনে এখানকার একটি পয়েন্টেই ২০-৩০ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। যেখানে বেশিরভাগই ষোলআনা ফসল ফলতো। এখনও যদি ভাঙন ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তারপরও আশপাশের পরিবারগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব।
নদী ভাঙনের মুখে পড়া বাসিন্দা নূরি আক্তার বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে এখানে একটু একটু করে নদী ভাঙছে। আজ সকালে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়। ভাঙনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, কেউ কোনো কিছুই রক্ষা করতে পারে নাই। গাছ-গাছালি, বাঁশ ঝাড় সবকিছু নদীতে নিমিষেই তলিয়ে গেছে। এখন শুধু বাড়ি-ঘর কয়েকটা আছে। দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলানো জরুরি। নয়তো আমাদের ঠাঁইটুকু ভেঙে গেলে আমাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হবে।
কৃষক চান্দু মিয়া বলেন, হঠাৎ করে সকালে ভাঙনে আমার বড় বড় আম গাছ, জাম, মেহগনি, জাম্বুড়া, আতাফলের গাছ ও বাঁশঝাড় সব কিছুই নদীর মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। আতঙ্কে ঘর খুলতেছি অন্য কোথাও যেতে হবে। তিনি ভারি গলায় বলেন, সবাই আসে শুধু আশ্বাস দেয় কিন্তু কাজ করে না। শুধু শুনি বরাদ্দ হয়েছে, কিন্তু কাজ না হওয়ায় আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়লাম।
মৃত আবদুস সোবহানের স্ত্রী বিধবা রেজিয়া বেওয়া বলেন, মাটির কাজ করে ১০ শতক জায়গা করছিলাম। কিন্তু তা নদীতে ভেঙে গেল। কয়দিন আগে তিনটা গাছ, আজ আবার ৪টা গাছসহ ১০ শতক জমি নদী গিলে খেলো। কোথায় থাকব, কে দেখবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েকদিন আগে ভাঙনের খবরে স্থানটিতে জেলা প্রশাসক-ইউএনও, চেয়ারম্যান ও সরকারি লোক পরিদর্শন করে গেলেও ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এখনো চোখে পড়েনি। ফলে তাদের অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তাদের দাবি, এখনই যদি জিও ব্যাগ বা ব্লক ডাম্পিং করা যায়, তাহলেও ওই এলাকার ভাঙনের মুখে পড়া পরিবারগুলো বিলীনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, শুকনা মৌসুমে স্থানটির (দক্ষিণ রসুলপুর) খুব নিকট থেকে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে নিরীহ এই মানুষগুলোকে। তাদের দাবি, বালু তুলতে বাধা-নিষেধ এমনকি অনুরোধ করতে গেলেও বাড়ি-ঘর ভাঙচুরসহ জীবননাশের হুমকি রয়েছে তাদের। ফলে তারা নাম প্রকাশ করে বলতেও ভয় পান। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধির প্রভাবে সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সাদুল্লাপুর উপজেলায় ভাঙনে নদী তীরবর্তী অন্তত আট শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছেন। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। ভাঙন এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়তই নতুন করে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, ফসলের জমি।
ফুলছড়ি উপজেলার দক্ষিণ রসুলপুর ছাড়াও ফজলুপুর ইউনিয়নের চৌমহন চর, খাটিয়ামারি, দক্ষিণ খাটিয়ামারি ও কাউয়াবাদা, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার লালচামার ও কেরানীর চর, কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালির খামার, হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ী এবং সদর ও সাঘাটা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

গাইবান্ধার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্ষার চলমান মৌসুমে নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির প্রভাবে জেলার সুন্দরগঞ্জ ও গোবিন্দগঞ্জের দুই উপজেলার প্রায় ৯০০ বিঘা জমির ফসল পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে পাট ৩০ হেক্টর, আউশ ৪৫ হেক্টর, তিল ২৫ হেক্টর, শাকসবজি ১০ হেক্টর ও আমন বীজতলা ৮.০২ হেক্টর। এসব আক্রান্ত ফসলের বেশিরভাগই সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়।
কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সোহেল রানা শালু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভাঙনের স্পটটি আমি দেখেছি। একটি পয়েন্টে ধীরে ধীরে ভাঙছে। এসময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে সেখানে ডিসি, ইউএনও গিয়েছিলেন। তারাই দেখে গেছেন, আমি সামান্য চেয়ারম্যান আমার আর কী করার থাকে।
ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা স্থানটি পরিদর্শন করেছি। তার আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড সংশ্লিষ্টরাও সেখানে গিয়েছিলেন। ডিসিসহ পরিদর্শন করার পর বিষয়টি অবগত করে তাৎক্ষণিকভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে পদক্ষেপ নিতে জানানো হয়েছে। এসময় বিষয়টি নিয়ে আবারও তার সাথে কথা বলবেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে পানি বৃদ্ধির প্রভাবে গাইবান্ধার বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, তিস্তা ও ঘাঘটের নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলে ২০ থেকে ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন শুরু হচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে ১০ থেকে ১২টি পয়েন্টে জরুরি কাজ হচ্ছে। অন্য পয়েন্টগুলোতেও দ্রুতই কাজ করা হবে।
এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লার সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি। পরে ক্ষুদেবার্তা দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
এসএইচএ
