বিজ্ঞাপন

‘চোখের নিমিষে ভিটেবাড়ি নদী খায়া গেল’

‘চোখের নিমিষে ভিটেবাড়ি নদী খায়া গেল’

‘চোখের নিমিষে ভিটেবাড়ি নদী খায়া গেল। চার চারটা ঘর কোনো রকমে সরে নিয়া গ্যাছি। তিনটা আম গাছ, একটা জাম গাছ কাটার আগেই নদীত চরি গ্যাইছে। এই শোকে-দুঃখে বাড়ি ভাঙার তিন দিন পর বাবা কাদের আলী (৬২) মারা গ্যাছে। কোনো রকমে চর বিদ্যানন্দ থেকে দক্ষিণে আনন্দ বাজারে অন্যের জমিতে ঘর তুলছি। আমাগো কষ্ট কেউ দ্যাখে না।’ বুকে কষ্ট চেপে কথাগুলো বললেন মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে কাফি (৩৬)।

সরেজমিনে সোমবার (৬ জুলাই) কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইঊনিয়নের চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রাম ঘুরে দেখা যায় ভাঙনের তাণ্ডব। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় তিস্তা নদীর ভাঙন চলমান রয়েছে। ভাঙনে রক্ষা পায়নি বাড়ি-ঘর, গাছপালা কিংবা আবাদী জমি। কৃষকের বাদাম, আমন ধানের বীজতলা, মরিচ, বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজী, পাট ও ভুট্টা নদীগর্ভে চলে গেছে। তিস্তা নদীতে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে ও বাতাসের কারণে কিছুক্ষণ পর পর ফসলি জমি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। নদী ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে দুই গ্রামের মানুষ তিস্তা পাড়ে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করে। এ সময় বক্তব্য দেন, মাঈদুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম, আশরাফুল প্রমূখ।
চর বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ গ্রামের শরিফুল বলেন, গত ১৫দিনে চর বিদ্যানন্দ ও তৈয়বখাঁ গ্রামের ১৯টি বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। এর মধ্যে চর বিদ্যানন্দে গৃহহীন হয়েছে কাফি (৩৫), আ. জলিল (৫৫), রশিদুল ইসলাম (৩৩), গনি মুন্সী (৫০), মোতালিব (৫০), আশরাফুল (৬০), লোকমান (৫০), জয়নাল (৬০) আ. সালাম (৪৫), রফিকুল (৪৫), সফিকুল (৩০)।


এ ছাড়া চর তৈয়বখাঁ গ্রামে নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন মোস্তফা কামাল (৫৫), রোস্তম (৫০), সাত্তার (৬০), জহুরুল (৪২), আইয়ুব আলী (৬৫), মোকছেদ (৪৫), রওশন আরা (৫০), ফকরুল ইসলাম (৪৫)।
একই ইউনিয়নের তৈয়বখাঁ গ্রামের রোস্তম আলী বলেন, এই নিয়ে পাঁচবার ভিটেবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। সেইসঙ্গে আড়াই বিঘা পাট ও আমন ধানের বীজতলা নদী ভেঙে নিয়ে গেছে। অনেক কষ্টে অন্যের জমিতে ঘর তুলে রেখেছি। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা পাই নাই।

চর বিদ্যানন্দ গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, পূর্বচর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মসজিদ ভাঙনের কবলে পড়েছে। স্কুল ঘরটি ভেঙে গেলে ছেলে-মেয়েদের লেখা-পড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। এ ছাড়া দুই শতাধিক বাড়ি ভাঙন হুমকিতে রয়েছে। দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে চরের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া বিঘ্নিত হবে।
একই ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দন গ্রামের ফাতেমা বেগম (৫০) বলেন, ‘যেভাবে নদী ভাঙবের লাগছে, তাতে হামার বাড়ি ভাঙি যাইবে। এই বাড়ি ভাঙি গেইলে কই থাকমো, কই যামো। হামার দেখি কাউয়ো দেখে না।’


বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম বলেন, আমার ইউনিয়নের ৭৫ ভাগ এলাকা মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে গেছে। চর বিদ্যানন্দ ও তৈয়বখাঁ গ্রাম ভাঙতে ভাঙতে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় গিয়ে ঠেকেছে।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জেলাজুড়ে প্রায় ৪০টি পয়েন্টে ভাঙন চলমান রয়েছে। গুরত্বপূর্ণ বিবেচনা করে প্রায় ৩০টি পয়েন্টে ২ লাখ জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। চরাঞ্চলের জন্য বাজেট না থাকায় আমরা সেখানে কাজ শুরু করতে পারেনি।

মমিনুল ইসলাম বাবু/এএমকে