বিজ্ঞাপন

পেঁয়াজের বাম্পার ফলনেও দাম না পেয়ে ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিনের ভরসায় চাষিরা

পেঁয়াজের বাম্পার ফলনেও দাম না পেয়ে ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিনের ভরসায় চাষিরা

রংপুর অঞ্চলে এবার পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন এবং কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ নিয়ে শঙ্কায়ও রয়েছেন চাষিরা। এ পরিস্থিতিতে ভালো দাম পেতে দীর্ঘদিন পেঁয়াজ সংরক্ষণে এখন কৃষকের ভরসার নাম ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন। পেঁয়াজ সংরক্ষণে আধুনিক এ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।

পেঁয়াজ চাষিরা জানান, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০-৩৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন মৌসুমে বাজারে এককালীন প্রচুর পেঁয়াজ আসায় দাম কমে যায়। গত বছর যেখানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এবার তা ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া পেঁয়াজ তোলার মৌসুমে টানা বৃষ্টিতে ফলনের ক্ষতি হয়েছে।

এমন অবস্থায় পেঁয়াজ সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন চাষিরা। ব্যবহার করছে ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন। এ প্রযুক্তিতে পেঁয়াজের স্তূপ বা গাদার ভেতর ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত বাতাস প্রবাহিত হয়। এতে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা কম থাকে এবং পেঁয়াজ বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায়।

দেশে যত পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, তার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ নানান কারণে নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে সংরক্ষণের অভাবে পচে যায়। এ পরিস্থিতিতে চাহিদার বেশি উৎপাদিত  পেঁয়াজ সংরক্ষণে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করছে কৃষি বিভাগ।

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ পর্যন্ত পেঁয়াজ চাষিদের মাঝে ১৪০টি ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন সরবরাহ করেছে। এ মেশিনের মাধ্যমে সর্বনিম্ন ছয় মাস পর্যন্ত ২৫০-৩০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব। বিদ্যুতের সাহায্যে দিন-রাতে অন্তত দুইবার ২-৩ ঘণ্টা এ মেশিন চালু রাখা সম্ভব। এতে নিচ থেকে বিশেষ উপায়ে বাতাস বের হয়ে পেঁয়াজকে সতেজ রাখে।

‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন কী?

পেঁয়াজ সংরক্ষণের ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন ব্যবহারের জন্য পেঁয়াজ সরাসরি মেঝেতে না রেখে মাচার ওপর গাদা করে রাখা হয়, যাতে নিচে বাতাস চলাচল করতে পারে। পেঁয়াজের স্টোর রুম বা ঘরের নিচে বা পাশে একটি ব্লোয়ার লাগানো হয়। যেটি পেঁয়াজের গাদার মধ্যে জোরে বাতাস ঢুকিয়ে দেয়। মূলত ব্লোয়ারটিই হলো ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন।

মেশিনটি চালু থাকলে ব্লোয়ার থেকে বাতাস চারদিকে ঘুরে। এতে পেঁয়াজ শুকনো রাখে, তাপমাত্রা কমায়, আর্দ্রতা বের করে ছত্রাক, পচা, গলা ও নরম হওয়া কমায়। ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন ব্যবহার করে অনেক কৃষক ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ ভালো রাখতে পেরেছেন বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।

‘এয়ার ফ্লো’ ঘিরে ভালো দামের আশায় চাষিরা

প্রণোদনা হিসেবে ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন পাওয়া একাধিক কৃষক জানান, আগে ঘরে খোলা জায়গায় মাত্র ১৫-২০ দিন পেঁয়াজ রাখা যেত। এরপর ওজন কমে যেত বা পচে যেত। এখন ভালো দাম পাওয়ার আশা ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে তারা পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন। তবে দীর্ঘদিন ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করলে পেঁয়াজের ওজন কী পরিমাণ কমে তা এখনো তাদের পরীক্ষা করার সুযোগ হয়নি।  

জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার চককরিম গ্রামের পেঁয়াজ চাষি সাইদুর রহমান এবারই প্রথম ৪০ মণ পেঁয়াজ এ মেশিনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করছেন। অন্যদিকে মিঠাপুকুর উপজেলার নুরপুর এলাকার আবু তালেব নামের এক চাষি প্রায় পাঁচ মাস ধরে ৫০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন। তিনি ৩৫ শতক জমিতে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে ৬০ মণ পেঁয়াজ পেয়েছিলেন।

নাসিরাবাদ এলাকার চাষি আজহার আলী জানান, গত বছর শতক প্রতি ফলন পেয়েছিলেন দুই মণ। এবার পেয়েছেন সোয়া এক মণ। দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় লক্ষাধিক টাকা। কিন্তু বাজারে দাম না পাওয়ায় অধিকাংশ পেঁয়াজ সংরক্ষণে এখন তার শেষ ভরসা ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন।

পেঁয়াজ উৎপাদনে রেকর্ড

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০২৫-২০২৬ রবি মৌসুমে ১২ হাজার ১০৫ হেক্টর জমি থেকে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬৬ টন পেঁয়াজ উৎপাদন করেছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। মশলাজাতীয় এই ফসল উৎপাদনে গত বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছেন তারা। গত ২০২৪-২০২৫ রবি মৌসুমের ১০ হাজার ২২৩ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদিত ১ লাখ ১৯ হাজার ৮১১ টন পেঁয়াজের তুলনায় এবার ২৩ হাজার ৮৫৫ টন বেশি উৎপাদন হয়েছে।

এর আগে, গত ২০২৩-২০২৪ রবি মৌসুমে কৃষকরা ১০ হাজার ৬ হেক্টর জমি থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৯১ টন এবং ২০২২-২০২৩ রবি মৌসুমে ৮ হাজার ৮৩৪ হেক্টর জমি থেকে ১ লাখ ৪ হাজার ২৬৩ টন পেঁয়াজ উৎপাদন করেছিলেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়ে দেশের চাহিদা মেটাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের ফলে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ছে। সঙ্গে পেঁয়াজ সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের শঙ্কাও কমিয়েছে।

বাড়তি পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভাব বড় সমস্যা

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলায় মোট পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার টন। অথচ জেলায় বার্ষিক চাহিদা মাত্র ৫৩ হাজার ২৫০ টন। ফলে প্রতি বছরই উৎপাদিত বাড়তি পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভাব একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এ জেলায় পেঁয়াজের আবাদ বেড়ে যাচ্ছে। কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফলনের ভালো দাম পায় এজন্য পেঁয়াজ সংরক্ষণে প্রণোদনায় ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন স্থাপন করে দেয়া হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো পেঁয়াজের বাজার যখন নিম্নমুখী থাকবে, তখন দ্রুত পচনশীল এ পণ্য কয়েক মাস সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষকরা যাতে সুবিধামতো বিক্রি করতে পারেন। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরকে

বিজ্ঞাপন