কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণের জন্য সরকারি উদ্যোগে মানিকগঞ্জ জেলার বিভিন্ন মাদরাসায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বিপুল পরিমাণ লবণ। উদ্দেশ্য ছিল চামড়া নষ্ট হওয়া রোধ করে দেশের চামড়া শিল্পকে সহায়তা করা। তবে সেই লবণ চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহার না করে মজুত রেখে খাবার হিসেবে ব্যবহার এবং কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে জেলার বিভিন্ন মাদরাসার বিরুদ্ধে।
এতে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণ কার্যক্রম ও আয়োডিনবিহীন এসব লবণ খাবারে ব্যবহার করায় স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, গত ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণের জন্য মানিকগঞ্জ জেলায় মোট ৭৫ টন লবণ বরাদ্দ দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জেলার ২১৬টি মাদরাসায় চাহিদা অনুযায়ী এসব লবণ বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে চামড়া সংরক্ষণে লবণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করা মাদরাসা শিক্ষকদের দাবি, ১ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ করেছেন তারা। কিভাবে লবণ দেওয়া হয় তা শেখানো হয়নি। শুধু চামড়ার বিষয়ে আলোচনা করেছে।
জেলার বিভিন্ন মাদরাসায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার মালেকিয়া আশরাফুল উলুম মাদরাসা ও এতিমখানা, সিংগাইর পৌরসভার গোলড়া দারুল উলুম হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা, সিংগাইর উপজেলার বাস্তা আশরাফিয়া জামিউল উলুম মাদরাসা ও বাস্তা হযরত উম্মে হানী (রা.) মহিলা মাদরাসা, সদর উপজেলার মাদরাসা আবু হুরায়রা ও খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদরাসা এবং লেমুবাড়ি আশরাফিয়া হাফিজিয়া মাদরাসাসহ বিভিন্ন মাদরাসার বিরুদ্ধে চামড়া সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া লবণ বিক্রি ও রান্নায় ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
আরও জানা যায়, চামড়া সংরক্ষণের জন্য কোনো লবণ ব্যবহার করা হয়নি। কিছু লবণ চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। আবার কিছু লবণ মুদি দোকানে বিক্রি করা হয়েছে। আর অবশিষ্ট লবণের ক্রেতা খোঁজা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ মাদরাসায় শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের খাবারের জন্য রেখে দিয়েছেন।
তবে ব্যতিক্রম দেখা যায়, জেলার হরিরামপুর উপজেলার মাদরাসাগুলোতে। এই উপজেলায় সর্বমোট ১২টি মাদরাসা লবণ ব্যবহার করেছে। তারা প্রত্যেকেই চামড়া ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই লবণের যথাযথ প্রয়োগ করেছেন।

পরিচয় গোপন রেখে ক্রেতা পরিচয়ে লেমুবাড়ি আশরাফিয়া হাফিজিয়া মাদরাসায় যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। এ সময় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ প্রতি মণ লবণ ৬৫০ টাকা দরে বিক্রির কথা জানায়।
পরবর্তীতে সাংবাদিক পরিচয়ে যোগাযোগ করা হলে মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ঈদের দিন রাত ১২টায় চামড়া বিক্রি করেছি। আমরা লবণ দিতে জানি না তাই চামড়ায় লবণ দেইনি। ঈদের ১৩ দিন পর এক চামড়া ব্যবসায়ীর কাছে ৩৫০ টাকা মণ দরে লবণ বিক্রি করেছি।
অন্যদিকে সদর উপজেলার মাদরাসা আবু হুরায়রা ও খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদরাসার শিক্ষক বলেন, আমরা দুই মাদরাসা মিলে ৩০ বস্তা লবণ পেয়েছি। আমি প্রশিক্ষণে সরাসরি বলেছি আমরা চামড়ায় লবণ ব্যবহার করতে পারব না। পরে সেখানে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বলেছেন আপনারা যা ভালো মনে করেন কইরেন। আমরা লবণ রেখে দিয়েছি, এখানকার রান্নায় লবণ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।
এই লবণ তো আয়োডিন যুক্ত নয়। খাবার উপযুক্ত নয় তাহলে কেন এই লবণ খাবার জন্য রেখে দিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা পানিতে ভিজিয়ে বিশুদ্ধ করে খাও।
অন্যদিকে কিছু মাদরাসার প্রতিনিধি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করলেও তারা লবণ বরাদ্দ পাননি। তাদের থেকে ও কম চামড়া সংগ্রহ করে লবণ বরাদ্দ পেয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
বড়ুন্ডি তাজবিদুল কোরআন মাদরাসার প্রতিনিধি বলেন, আমরা ট্রেনিং করেও লবণ পাইনি। আমাদের অনেকগুলো চামড়া কালেকশন হয়। কিন্তু পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) অফিস থেকে জানানো হয় ৪ বস্তা গলা লবণ আছে সেগুলো আনতে বলেছিল। আমরা গলে যাওয়া লবণ দিয়ে কি করব। এই ৪ বস্তা লবনে আমাদের কিছুই হবে না তাই আনিনি।
সিংগাইর উপজেলার বাস্তা আশরাফিয়া জামিউল উলুম মাদরাসা ও বাস্তা হযরত উম্মে হানী (রা.) মহিলা মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মহিউদ্দিন বলেন, আমরা কিছু লবণ চামড়ায় ব্যবহার করেছি। বাকি লবণ রেখে দিয়েছি, মাদরাসায় খাবার কাজে লাগে। আসলে আগে আমাদের সব চামড়ায় লবণ দেওয়া হত, এখন লোকবলের অভাবে দিতে পারি না।
দুইটি মাদরাসাসহ তারা মোট ১৫০০ কেজি লবণ বিনামূল্যে পেয়েছেন। এদিকে খাবার অযোগ্য লবণ কেন মাদরাসায় খাবারের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি জানতাম না এগুলা খাওয়া যাবে না। এখন কি করব আপনি বলে দেন। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব।
অন্যদিকে চামড়া ব্যবসায়ীদের কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, অনেক মাদরাসা থেকে তারা চামড়া ও লবণ আলাদাভাবে টাকা দিয়ে কিনেছেন। অথচ সরকার বিনামূল্যে চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ সরবরাহ করেছিল। যথাযথভাবে লবণ ব্যবহার করা হলে চামড়ার মান ভালো থাকত এবং বাজারমূল্যও বৃদ্ধি পেত। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাব ও অনিয়মের কারণে সরকারি উদ্যোগের সুফল অনেকটাই নষ্ট হয়েছে।
চামড়া ব্যাবসায়ী বিরেন রবি দাস বলেন, আমরা চামড়ায় কোনো লবণ পাইনি। প্রায় ৬৫০টি চামড়া কিনেছি এবার। সঠিক সময়ে চামড়ায় লবণ না দেওয়ায় কিছু চামড়ার টেম্পার অনেকটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমাদের ২৫-৩০টি চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে লবণ ব্যবহার না করায়।
আরেক চামড়া ব্যবসায়ী মিলন রবি দাস প্রায় ৯০০টি চামড়া কিনেছেন। তিনি জানান, কিন্তু কোনো লবণ পাননি। তার প্রায় ৫০-৬০টি চামড়া নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মাদরাসা থেকে তারা চামড়া ও লবণ আলাদাভাবে টাকা দিয়ে কিনেছেন। শুনেছি সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ায় ব্যবহারের জন্য বিনামূল্যে লবণ দিয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. রফিকুল ইসলাম নামের এক চিকিৎসক জানান, আয়োডিন ছাড়া লবণ খাবার যোগ্য নয়। এই লবণ খেলে গলগণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের রোগ হতে পারে।
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা ঢাকা পোস্টকে বলেন, যদি তাদের বিরুদ্ধে লবণ বিক্রি বা খাবারে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাইফুল ইসলাম/আরকে
