টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাতে জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরি নদী ও বিভিন্ন ছড়ার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ নিয়ে নিচু এলাকা, নদী তীরবর্তী বসতি এবং পাহাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত দুই দিনের থেকে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বান্দরবান সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। আজ স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ফুট ওপর দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বান্দরবান পৌর এলাকার আর্মিপাড়া,অফিসার্স ক্লাব সংলগ্ন এলাকা, শেরে বাংলা এলাকা, মোহাম্মদপুর এলাকাসহ নদী তীরবর্তী এলাকাসমূহ প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
জেলার থানচি ও রুমা উপজেলায় নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় নদীপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল বন্ধ রয়েছে। থানচি উপজেলার তিন্দু, রেমাক্রী ও নাফাখুম, আমিয়াখুমসহ কয়েকটি পর্যটন এলাকায় গতকাল থেকে শতাধিক পর্যটক আটকা পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ-আল-ফয়সাল জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে ঝুঁকি নিয়ে নৌযান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পর্যায়ক্রমে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে নদীর পানি ও স্রোত স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অপ্রয়োজনে নদীপথে যাতায়াত না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে বিদ্যমান আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় গতকাল সোমবার (৬ জুলাই) জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিক এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পর্যটক ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বান্দরবানের সকল পর্যটনকেন্দ্র আগামী ১০ জুলাই (শুক্রবার) পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে জেলার সকল পর্যটন কেন্দ্র, ঝর্ণা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ, দুর্গম এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যটক, ট্যুর অপারেটরসহ সর্বসাধারণের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়।
অন্যদিকে প্রবল বর্ষণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল টানা ভারী বর্ষণের কারণে বান্দরবান-থানচি সড়কের নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্র সংলগ্ন ২৩ কিলোমিটার এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ৪০ ফুট সড়ক মাটি ও পাথরের স্তূপে ঢেকে গিয়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মাটি ও পাথর অপসারণ কার্যক্রম শুরু করেন। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে তারা সড়কের ওপর জমে থাকা মাটি সরিয়ে ফেলেন। তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পুনরায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এছাড়াও রুমা কেওক্রাডং সড়কেও ভূমিধসের খবর পাওয়া গেছে। সেখানেও সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক মাটি অপসারণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করে। একই দিনে রুমা কেওক্রাডং সড়কেও ভূমিধসের খবর পাওয়া গেছে। পরে সেনাবাহিনী মাটি অপসারণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করে।
গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে আলীকদম উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। উপজেলার সদর ইউনিয়ন ও চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে লামা-আলীকদম-ফাঁসিয়াখালী সড়কের রেপারপাড়া, শীবাতলীসহ একাধিক স্থানে সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও স্থানীয়দের ভ্যানগাড়ি ও নৌকায় করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পারাপার হতে দেখা গেছে। বন্যার কারণে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী এবং জরুরি সেবাগ্রহীতারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে জনগণকে সতর্ক করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আলীকদমে ১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ায় পার্বত্য জেলার অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও মুঠোফোন নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, পানি আরও বাড়তে থাকলে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে পুরো জেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং জনগণকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় এখনো ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় সবাইকে অপ্রয়োজনীয় চলাচল থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি সরকার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। স্থানীয় প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি সবাইকে আতঙ্কিত না হয়ে কোনো জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিলে দ্রুত স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত বান্দরবানে ১২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
আরএআর
