বিজ্ঞাপন

বিনামূল্যে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের পানি পান করান মুন্নু শেখ

বিনামূল্যে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের পানি পান করান মুন্নু শেখ

কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের হুইসেল শুনলেই ছুটে যান। হাতে থাকে ঠান্ডা পানির বোতল। এক বগি থেকে আরেক বগিতে ঘুরে তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে তুলে দেন পানি। বিনিময়ে নেন না কোনো অর্থ, শুধু খোঁজেন মানুষের মুখের একটুখানি হাসি। ছয় বছর আগে সন্তান হারানোর শোক ভুলতে নয়, বরং সেই স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে ছয় বছর ধরে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে বিনামূল্যে পানি তুলে দিচ্ছেন মুন্নু শেখ। তার এই মানবিক উদ্যোগে প্রতিদিন মেটে অসংখ্য মানুষের তৃষ্ণা।

মুন্নু শেখ রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম রতনদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। প্রায় ২০ বছর ধরে স্টেশনসংলগ্ন ছোট্ট একটি চটপটির দোকান চালিয়ে সংসার চালালেও এলাকার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত মানবতার ফেরিওয়ালা হিসেবে। তবে এই মানবিক উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এক বেদনাময় গল্প।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে তার নয় বছর বয়সী ছেলে সবুজ শেখ ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ট্রেনে করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হতো। চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে এমন দিনও গেছে, যখন অসুস্থ ছেলের জন্য এক বোতল পানি কেনার সামর্থ্যও ছিল না তার।

দীর্ঘ দুই বছরের লড়াই শেষে ২০২০ সালে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যায় ছোট্ট সবুজ। সন্তানের মৃত্যু মুন্নু শেখকে ভেঙে দিলেও সেই শোককে তিনি রূপ দিয়েছেন মানবসেবার শক্তিতে। সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন—যতদিন বেঁচে থাকবেন, ট্রেনে কোনো তৃষ্ণার্ত মানুষকে সম্ভব হলে পানির কষ্ট পেতে দেবেন না। সেই অঙ্গীকার আজও অটুট।

প্রতিদিন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা খুলনাগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন কালুখালী স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই তিনি ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল ভালোভাবে ধুয়ে টিউবওয়েলের পরিষ্কার পানি ভরে প্রস্তুত রাখেন। ট্রেন থামামাত্রই যাত্রীদের হাতে বিনামূল্যে তুলে দেন সেই পানি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কালুখালী স্টেশনে এখন মুন্নু শেখ শুধু একজন চটপটি বিক্রেতা নন, তিনি মানবতার এক নীরব দূত। নিজের সন্তানকে হারানোর বেদনা বুকে নিয়েও প্রতিদিন অসংখ্য অচেনা মানুষের মুখে স্বস্তির হাসি ফোটাচ্ছেন তিনি।

মুন্নু শেখ বলেন, যখন কোনো ছোট শিশুর হাতে পানির বোতল তুলে দিই, তখন আমার ছেলে সবুজের মুখটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, যেন ওকেই পানি খাওয়াচ্ছি। যতদিন বেঁচে থাকব, এভাবেই মানুষের সেবা করে যেতে চাই।

তিনি বলেন, চটপটি বিক্রির পাশাপাশি প্রতিদিন বোতল সংগ্রহ করি। ট্রেন আসার আগে সেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার পানি ভরে রাখি। মানুষের দোয়া আর তৃষ্ণা মেটানোর পর তাদের মুখের হাসিই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

এই মানবিক কাজের জন্য প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা দোকান বন্ধ রাখতে হয় তাকে। এতে কিছু আর্থিক ক্ষতি হলেও তাতে তার কোনো আফসোস নেই।

নকশিকাঁথা মেইলের যাত্রী সোহেল রানা বলেন, ট্রেনে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। একজন সাধারণ মানুষ হয়েও তিনি যে মানবিকতার পরিচয় দিচ্ছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। তার দেওয়া পানি পান করে শুধু তৃষ্ণাই মেটে না, মানুষের প্রতি বিশ্বাসও আরও দৃঢ় হয়।

কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার দীনবন্ধু রায় বলেন, মুন্নু শেখ দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করিয়ে আসছেন। প্রতিদিন নকশিকাঁথা মেইল স্টেশনে এলে তাকে যাত্রীদের হাতে পানি তুলে দিতে দেখা যায়। তার এই উদ্যোগে অনেক যাত্রী উপকৃত হচ্ছেন। একজন সাধারণ মানুষ হয়েও তিনি যে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এমন উদ্যোগ সমাজের অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে আমি মনে করি।

মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/এসএইচএ