বিজ্ঞাপন

শুধু চারা বিক্রি করে বছরে আয় ৮ লাখ টাকা

‘নয়নপুরী লটকন’ চাষে বদলে গেছে রোকনউদ্দিনের জীবন

‘নয়নপুরী লটকন’ চাষে বদলে গেছে রোকনউদ্দিনের জীবন

একসময় জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় ইমামতি করতেন হাফেজ রোকনউদ্দিন। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অবসরের সময়টুকু কাটত গাছের সঙ্গে। মসজিদ, মাদরাসা কিংবা নিজের বাড়ির আঙিনায় একের পর এক ফলগাছ লাগাতেন তিনি। সেই শখই ধীরে ধীরে রূপ নেয় স্বপ্নে। আর সেই স্বপ্নের পথ ধরে আজ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নয়নপুর গ্রামে চার বিঘা জমিজুড়ে গড়ে তুলেছেন দুটি লটকনের বাগান। শুধু ফল বিক্রিই নয়, উন্নত জাতের কলম উৎপাদনের মাধ্যমেও তৈরি করেছেন আয়ের নতুন সম্ভাবনা। তার উদ্ভাবিত একটি জাত এখন স্থানীয়ভাবে ‘নয়নপুরী লটকন’ নামে পরিচিত।

গত সোমবার (৬ জুলাই) নয়নপুর গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি লটকনগাছ। ফলের ভারে নুয়ে পড়া ডাল, সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা হলুদাভ লটকনের থোকা আর বাগানজুড়ে পাইকারদের ব্যস্ত আনাগোনা মিলিয়ে যেন উৎসবের আমেজ। মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেক কৃষক ছুটে আসছেন শুধু উন্নত জাতের কলম সংগ্রহ করতে।

রোকনউদ্দিন জানান, ২০১৮ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে মাত্র ৩০টি লটকনের চারা কিনে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরে একটি পুরোনো বাগান যুক্ত করে প্রায় ২০০টি গাছ নিয়ে শুরু করেন বাণিজ্যিক চাষ। তবে শুরুটা সহজ ছিল না। অনেক গাছই পুরুষ হওয়ায় আশানুরূপ ফলন পাননি। কিন্তু সেই ব্যর্থতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং নিজেই কলম তৈরির কৌশল শিখে ভালো ফলনশীল গাছ নির্বাচন করে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজে নেমে পড়েন। ২০২৩ সাল থেকে ধীরে ধীরে সফলতা আসতে থাকে তার। আর এ বছরই ব্যাপকভাবে সফলতার দেখা পান।

তিনি বলেন, গত আট বছরে ৮ থেকে ১০টি জাত নিয়ে কাজ করেছি। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুটি জাত সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতের ফল বড়, খেতে খুব মিষ্টি এবং বাজারে এর চাহিদাও বেশি।

এই উন্নত জাতটির নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি গল্প। চলতি বছরে চ্যানেল আইয়ের কৃষিভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর উপস্থাপক শাইখ সিরাজ তার বাগান পরিদর্শনে যান। গ্রামের নামানুসারে জাতটির নাম ‘নয়নপুরী লটকন’ রাখার পরামর্শ দেন তিনি। এরপর থেকেই স্থানীয়ভাবে এ নামেই পরিচিতি পায় জাতটি।

বর্তমানে চার বিঘা জমির দুটি বাগানে লটকনের চাষ করছেন রোকনউদ্দিন। তার এক বছরের কলমের চারা বিক্রি হয় ১০০ টাকায়। আর দেড় থেকে দুই বছরের কলমের চারার দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও উদ্যোক্তারা তার কাছ থেকে এসব কলম সংগ্রহ করেন। শুধু চারা বিক্রি করেই বছরে আয় করেন ৭-৮ লাখ টাকা।

রোকনউদ্দিন বলেন, ভালো জাতের চারা না হলে কৃষক লাভবান হবেন না। তাই পরীক্ষিত গাছ থেকে কলম তৈরি করি। আমি চাই, যারা আমার কাছ থেকে চারা নেবেন, তারা যেন সফল হন।

বর্তমানে তার বাগানের লটকন প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই ৭০-৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। বাকি সময়ে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। নিজের বাগানের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি বাগানের ফলও পাইকারিভাবে কিনে বাজারজাত করেন।

গফরগাঁও থেকে বাগান দেখতে আসা কৃষক মো. এনামুল হক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বাগান দেখে ঘুরতে এসেছিলাম। ফল খেয়ে ভালো লাগায় ৩২টি কলম কিনেছি। ফলন ভালো হলে আমিও বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান করব।

স্থানীয় কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, রোকনউদ্দিনের লটকনের ফল বড়, সুস্বাদু এবং দেখতে আকর্ষণীয়। তাই তার চারার ওপর মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে।

ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, উপজেলার প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হচ্ছে। নয়নপুর গ্রামের হাফেজ রোকনউদ্দিনের লটকন বেশ সুস্বাদু এবং তিনি উন্নত মানের চারাও উৎপাদন করছেন। ভালো মানের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন নতুন বাগান গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতে ভালুকার লটকন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।

সাখাওয়াত সুমন/এএমকে