বিজ্ঞাপন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান

শিফাতের স্বপ্ন ছিল আলেম হওয়ার, হয়েছেন শহীদ

শিফাতের স্বপ্ন ছিল আলেম হওয়ার, হয়েছেন শহীদ

ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন শিফাত উল্লাহ। কখনোই কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। খুব শান্ত-শিষ্ট আর অমায়িক ব্যবহার ছিল ১৮ বছরের শিফাতের। বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মাদরাসাও। ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে আলেম হবেন। দ্বীনের খেদমত করবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আলেম হতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন এই তরুণ। 

শহীদ শিফাত উল্লাহর গল্প ছিলেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাংগালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের হাফেজ মাওলানা মো. নূরুজ্জামানের ছেলে। ২৪’র বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শিফাত উল্লাহ শহীদ হন। 

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন শিফাত উল্লাহ। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে শিফাত উল্লাহ দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই মাদরাসা লাইনে পড়ালেখা করেছিলেন। বড় আলেম হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন গাজীপুরের মাওনা ২নং সিএনবি জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম মাদরাসায়। 

সেখানে পড়ালেখা করার সময় ২০২৪ সালে দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আবু সাঈদ, মুগ্ধ মারা যাওয়ার পর রাস্তায় নেমে আসে মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ উলামায়ে কেরাম। তাদের সঙ্গে আন্দোলনে নেমেছিলেন শিফাত উল্লাহও। মাদরাসার অন্য শিক্ষার্থী ও উলামায়ে কেরামদের সঙ্গে মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। সবশেষ ৫ আগস্ট সরকারের কারফিউ উপেক্ষা করে মাওনা এলাকায় মিছিলে অংশ নেন শিফাত উল্লাহ। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মারা যান শিফাতসহ আরও চারজন। ৬ আগস্ট নিজ বাড়ি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাংগালিয়া ইউনিয়নের মুনিয়ারীকান্দা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে শিফাত উল্লাহর মরদেহ দাফন করা হয়। 

শহীদ শিফাত উল্লাহর বাবা হাফেজ মাওলানা নূরুজ্জামান বলেন, আমার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। তার মধ্যে শিফাত উল্লাহ দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিল। কোনো অন্যায়কে সে প্রশ্রয় দিতো না। বড় আলেম হতে মাদরাসায় পড়তে গিয়ে শহীদ হয়েছে আমার শিফাত। 

তিনি বলেন, ছেলে হারানোর শোক এ জীবনে পূরণ হওয়ার নয়। কোনোদিন হবেও না। আল্লাহর কাছে দোয়া করি আমার ছেলেকে যেন জান্নাতবাসী করেন। 

তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার ছেলের ইচ্ছে ছিল দেশটা যেন বৈষম্যমুক্ত হয় এবং স্বৈরাচার মুক্ত হয়। দেশে যেন ন্যায়বিচার ফিরে আসে। দেশটা যেন সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে। যে উদ্দেশ্যে নিয়ে উলামায়ে কেরাম, ছাত্র-জনতা সংগ্রাম করেছিল সেই উদ্দেশ্য এখনো পূরণ হয়নি।

তিনি আরও বলেন, যে উদ্দেশ্যে সংগ্রাম হলো। সে উদ্দেশ্যে দেশে আমরা এখনো দেখতেছি না। ন্যায় বিচার দেখতেছি না, সুশাসন দেখতেছি না। বৈষম্যহীনতা দেখতেছি না। কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বেড়ে গেছে। এখন শহীদের মাথা বিক্রি করে ইনকাম করে। মামলা নিয়ে বিজনেস করে। আমার ছেলের হত্যায় মামলা দিলাম, কিন্তু কোনো হদিস মিলছে না। যে আশা, স্বপ্ন নিয়ে মানুষ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছিল, শহীদ হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, আহত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সেই স্বপ্ন এখনো অধরা রয়ে গেছে। 

মাওলানা নুরুজ্জামান বলেন, অন্তবর্তীকালীন সরকার ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ঘোষণা দিয়েছিল, সেটা আমরা পেয়েছি। মাসিক ভাতা নিয়মিত পাচ্ছি এবং বিভিন্ন দলীয়ভাবে যে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি যতটুকু ছিল অতটুকু যথাযথভাবেই পেয়েছি। 

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়াতে আমরা মর্মাহত। জুলাই সনদের খুব আকাঙ্ক্ষা ছিল। শিফাতসহ জুলাই-আগস্টে সব শহীদের হত্যার বিচার খুব আকাঙ্ক্ষিত, বিচারটা যেন আমরা পাই। তাহলে আমাদের আত্মাটা শান্তি পাবে।  

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শহীদ শিফাতের বড় ভাই হিজবুল্লাহ বলেন, শিফাত খুবই শান্তশিষ্ট ও ভদ্র ছিল। সহপাঠীসহ এলাকার সবার সঙ্গে সে ভালো ব্যবহার করতো। শিফাত আমার এক বছরের ছোট। ছোটবেলা থেকে আমরা একসঙ্গেই বড় হয়েছি। শুধুমাত্র এক বছর আমরা আলাদা থেকেছিলাম মাদরাসা পৃথক হওয়ার কারণে। ওই বছরই সে শহীদ হয়। একসঙ্গে বড় হওয়ার কারণে নানা স্মৃতি মনের মাঝে ভেসে উঠে। খুবই খারাপ লাগে তখন। 

শহীদ শিফাত উল্লাহর চাচা মো.কাঞ্চন মিয়া বলেন, শিফাত আমার ভাতিজা হয়। যখনই বাড়ি আসতো আমার ঘরের বারান্দায় এসে ঘুমাতো। খুবই নম্র-ভদ্র ছিলো শিফাত। বাড়িতে এলে নিজের মাদরাসায় পড়াতো, অনেক সময় অন্য মাদরাসায় গিয়েও পড়াতো। তার মৃত্যুতে আমরা খুবই কষ্ট পেয়েছি। তার মৃত্যুর বিচারটা যেন হয়, সরকারের কাছে সেই দাবি জানাচ্ছি।

পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শহীদ শিফাত উল্লাহর পরিবারকে সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ ও আহতদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে এবং এ ব্যাপারে সজাগ রয়েছে। 

আরকে