জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী মেহেরসাগর কলা এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় কৃষিপণ্য। জেলার বিভিন্ন কলার হাট থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার কলা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে। এই কলাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, যা বদলে দিচ্ছে হাজারো কৃষক ও ব্যবসায়ীর জীবন।
বিশেষ করে জেলার গাংনী উপজেলার হেমায়েতপুর কলার হাট বর্তমানে জেলার সবচেয়ে বড় কলার হাটগুলোর একটি। প্রতিদিন সকাল থেকে এখানে শুরু হয় কলা বেচাকেনা। স্থানীয় কৃষকরা মাঠ থেকে কলা এনে হাটে জড়ো করেন। পরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ফড়িয়া ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা ট্রাকভর্তি কলা কিনে নিজ নিজ গন্তব্যে নিয়ে যান।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু হেমায়েতপুর কলার হাট থেকেই প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার কলা বিক্রি হয়। অন্যদিকে মেহেরপুর সদর ও মুজিবনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন আরও ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক কলা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার কলার বাণিজ্য হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মেহেরপুর জেলায় প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে কলার আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। জেলায় জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মেহেরসাগর কলার পাশাপাশি চাপা, বাইশ ছড়ি, সবরি ও রং জাতের কলারও ব্যাপক চাষ হচ্ছে।
গাংনী উপজেলার হেমায়েতপুর গ্রামের কলাচাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয়ভাবে বড় কলার হাট গড়ে ওঠায় এখন আর দূরের বাজারে যেতে হয় না। পরিবহন খরচ কমেছে, একইসঙ্গে ন্যায্য দামও পাওয়া যাচ্ছে। এতে কৃষকদের মধ্যে কলা চাষের আগ্রহ বেড়েছে।
জুগিন্দা গ্রামের কৃষক ইবাদত হোসেন জানান, একবার কলার গাছ লাগালে সাধারণত দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। এক বিঘা জমিতে ৪০০ থেকে ৪৫০টি কলার গাছ লাগানো যায়। বাজারদরের ওপর নির্ভর করে প্রতিটি কলার কাঁদি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় কলা চাষে লাভ বেশি হওয়ায় এলাকার কৃষকরা দিন দিন এই চাষে ঝুঁকছেন।

বন্দর গ্রামের কৃষক রিপন আলী বলেন, আগে এ অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষক অন্যান্য আবাদ করতেন। কিন্তু উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় অনেকেই এখন কলা ও বিভিন্ন সবজি চাষে আগ্রহী হয়েছেন। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে কলা চাষ করে সব ধরনের ব্যয় বাদ দিয়েও ১ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব।
বরিশাল থেকে আসা ফড়িয়া ব্যবসায়ী ইব্রাহিম হোসেন বলেন, আমরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কলা সংগ্রহ করি। এতে ভালো মানের কলা সহজেই পাওয়া যায় এবং ব্যবসায়ও লাভ হয়। মেহেরপুরের কলার চাহিদা সারা দেশেই রয়েছে। শুধু আমি নই, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা হেমায়েতপুর হাট থেকে কলা কিনে নিয়ে যান।
আরেক পাইকারি ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন জানান, তিনি প্রতিদিন এক থেকে দুই ট্রাক কলা কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন। তিনি বলেন, মেহেরপুরের কলা স্বাদ, গন্ধ ও মানের দিক থেকে আলাদা। এ কারণে দেশের বাজারে এই কলার চাহিদা সবসময়ই বেশি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা বলেন, মেহেরসাগর কলা ইতোমধ্যে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং জিআই ট্যাগ ব্যবহারের অনুমোদনও পাওয়া গেছে। জিআই স্বীকৃতির মাধ্যমে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও মেহেরসাগর কলার পরিচিতি ও মূল্য বৃদ্ধি পাবে বলে আশা কছি। একইসঙ্গে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও কৃষি বিপণন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদেশে বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
মাহাবুল ইসলাম/এএমকে
