বিজ্ঞাপন

মুখে ভাষা নেই, রংতুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে কথা বলে সাবা

মুখে ভাষা নেই, রংতুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে কথা বলে সাবা

মুখে কথা নেই, কানেও শুনতে পায় না। কিন্তু তার রংতুলির স্পর্শে ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে ওঠে মানুষ, প্রকৃতি, ইতিহাস আর স্বপ্ন। বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী কিশোরী সাবা ইসলাম বর্ণ নিজের অসাধারণ চিত্রশৈলীর মাধ্যমে তৈরি করছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা পৌরসভা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের কাঠগড়া গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে সাবা। বাবা শফিউল আলম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং মা মুসলিমা খাতুন গৃহিণী। দুই ভাইবোনের মধ্যে বড় সাবা স্থানীয় সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। তার ছোট ভাইয়ের নাম আহনাফ ইসলাম (অর্নব)।

সম্প্রতি সাবাদের বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে টিনশেডের ছোট্ট দুই কক্ষের ঘরজুড়ে সাজানো অসংখ্য চিত্রকর্ম। দেয়ালে টাঙানো রয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, গ্রামীণ প্রকৃতি, মানুষের প্রতিকৃতি এবং নানা বিষয়ভিত্তিক ছবি। দেখে মনে হবে যেন কোনো অভিজ্ঞ শিল্পীর তুলির আঁচড়ে প্রাণ পেয়েছে প্রতিটি ক্যানভাস। ঘরের একপাশে শোকেসভর্তি রয়েছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অর্জিত ক্রেস্ট, মেডেল ও বই। দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে সাবার আঁকা আরও অনেক ছবি। 

এর মধ্যে বিশেষভাবে নজর কাড়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের রঙিন প্রতিকৃতি, যার বুকে কালো রঙে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তার ‘দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা (১৯৪৩)’ সিরিজের একটি অংশ। এ ছাড়া আর্জেন্টাইন তারকা ফুটবলার মেসি, বই হাতে খুদে শিশু, ষাঁড়ের লড়াইসহ নানা বিষয় তার ছবিতে স্থান পেয়েছে। মেয়ের আঁকা ছবিগুলো বিছানায় সাজিয়ে দেখাচ্ছিলেন মা মুসলিমা খাতুন।

এ সময় পাশের টেবিলে বসে জলরঙে অমর একুশের একটি ছবি আঁকছিল সাবা। পাশে দাঁড়িয়ে নিবিড়ভাবে মেয়ের কাজ দেখছিলেন মা। জলরং, তেলরং কিংবা পেনসিল স্কেচ— সব মাধ্যমেই সাবার দক্ষতা রয়েছে। এই বয়সেই কয়েকশ চিত্রকর্ম এঁকেছে সে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অর্জন করেছে অসংখ্য পুরস্কার। মুখে ভাষা না থাকলেও তার ছবিগুলো যেন হয়ে উঠেছে তার মনের ভাষা। চোখের সামনে যা দেখে, তাই ফুটিয়ে তোলে নিজের ক্যানভাসে।

মেয়ে কীভাবে একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী হয়ে উঠল, সেই গল্প শোনান মা মুসলিমা খাতুন। 

তিনি বলেন, মেয়ের ৯ মাস বয়সে বুঝতে পারি সে কানে শুনে না ও কথা বলতে পারবে না। যখন বিষয়টি আমরা নিশ্চিত হই তখন খুব কষ্ট হয়েছে। তখন নিজেদের মানিয়ে নিয়েছি আমরা। ছোটবেলায় মেয়েকে দেখতাম মাটিতে নানা কিছু আঁকত। এটি দেখে ও যখন শিশুশ্রেণিতে ভর্তি হয় তখনই আঁকা শেখার জন্য স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিই। টাঙ্গাইলের শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমিতে সে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ হয়ে ওঠে।

মা মুসলিমা খাতুন বলেন, সে জল রং, তেল রং, পেস্টিং, মোম রংসহ সব ধরনের রং দিয়ে ছবি আঁকতে পারে। যেকোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সে কোনো না কোনো পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়। তার ক্রেস্ট আছে অন্তত ষাটটি, বই আছে চার-পাঁচশ, সনদ আছে দুই থেকে আড়াইশ। সে মানুষের প্রতিকৃতি ও গ্রামীণ দৃশ্য বেশি আঁকে। সে যা-ই দেখে, তা-ই আঁকতে পারে। মা হিসেবে আমার গর্ব হয় যে আমার প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে এতদূর আগাতে পারছি। আমার মেয়ে যেন অনেকদূর আগাতে পারে, সে জন্য সবাই দোয়া করবেন। আমার স্বপ্ন, সে যেন স্বাবলম্বী হতে পারে। তাকে সেলাই প্রশিক্ষণ, ব্লক-বাটিক বা হাতের যত ধরনের কাজ রয়েছে তা শেখাব। আমার মেয়ের স্বপ্ন বিদেশে গিয়ে ছবি আঁকবে। সে আমাকে এ কথা সব সময় বোঝানোর চেষ্টা করে ইশারা-ইঙ্গিতে।

সাবার বাবা শফিউল আলম বলেন, আমার মেয়ের যখন ৯-১০ মাস বয়স তখন বুঝতে পারি সে বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী। আমরা চিকিৎসকের কাছে গেলে পরামর্শ দিয়েছিল উন্নত চিকিৎসার জন্য, যা করতে ১২-১৫ লাখ টাকা দরকার। সেটি আবার তিন-চার বছর পরপর পরিবর্তন করতে হবে। তখন আবার তিন-চার লাখ টাকা করে লাগবে। আমাদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে এটি করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও বলেন, মেয়ের ৪-৫ বছর বয়সের সময় আমরা যখন দেখি সে কোনো কিছু দেখেই লিখতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, তখন বুঝতে পারি তার ছবি আঁকার প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। যা দেখে তা হুবহু আঁকতে পারে সে। আমরা তখন টাঙ্গাইলে থাকতাম। তখন তাকে আঁকা শেখানো হয়। সে জেলা ও জাতীয় পর্যায়েও ছবি আঁকায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে।

শফিউল আলম বলেন, এখন আমার মেয়ে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। তাকে নিয়ে ভবিষ্যতে বড় কিছু করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। সে যেহেতু কথা বলতে পারে না, কানেও শোনে না, ছবি আঁকা বা শিক্ষাদানের মাধ্যমে যেন নিজের ব্যয় নিজে বহন করতে পারে, এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেন সে করতে পারে এবং কারও মুখাপেক্ষী না হতে হয়—সেটিই আমাদের পরিকল্পনা। আমাদের মেয়েকে নিয়ে প্রথমে যে দুশ্চিন্তা ছিল, এখন তা কেটে গেছে। আমাদের বিশ্বাস, সে নিজেই নিজেকে গড়ে নিতে পারবে।

বাড়ির আঙিনায় কথা হয় সাবার দাদি আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে। নাতনির সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। আনোয়ারা বলেন, জন্মের পর যখন দেখেছি মেয়েটা কথা বলতে পারে না, কানে শোনে না, তখন অনেক দুঃখ হয়েছে। কিন্তু আমাদের তো করার কিছুই নেই। এখন আমার নাতনি যে পর্যায়ে গেছে, সে যেন আরও ভালো করে, তার নাম যেন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে— সেই দোয়া করি। সে যা-ই দেখে, তা-ই আঁকতে পারে। এখন আর দুঃখ করি না, নাতনিকে নিয়ে গর্ব হয়।

প্রতিবেশী লাইলী বেগম বলেন, মেয়েটার দুঃখ শুধু কথা বলতে পারে না। সে ছোটবেলা থেকেই ভালো ছবি আঁকে। তার হাতের কাজ অনেক সুন্দর। সে মুখে কথা বলতে পারে না, কিন্তু হাতের আলোয় অনেক কিছু করছে। সে অনেক রকমের ছবি আঁকে দেখি, যে যা দেখায় তা-ই আঁকতে পারে। একজন সুস্থ মানুষ কথায় যা প্রকাশ করতে পারেন না, কথা বলতে না পারলেও সাবা তা এঁকে ফুটিয়ে তোলে।

সাবার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বছির উদ্দিন বলেন, সাবা আমাদের বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। সে অনেক ভালো ছবি আঁকে। একদিন আমার ছবি এঁকে নিয়ে আসে, যা দেখে অভিভূত হই। কিছু দেখলেই হুবহু আঁকতে পারে সে। তার অদম্য মেধা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ুক।

আরএআর