বিজ্ঞাপন

বৃষ্টি হলেই ‘নদীতে পরিণত হয়’ গাইবান্ধা শহর

বৃষ্টি হলেই ‘নদীতে পরিণত হয়’ গাইবান্ধা শহর

টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি যেন শহরের রূপই বদলে দিয়েছে। গেল ভোর থেকে টানা বর্ষণে গাইবান্ধা শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা অলি-গলি ও সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিতে যেন টই-টুম্বর হয়েছে জলবদ্ধের কবলে পড়া শহরের এলাগুলো। যে কারণে শহরের সচেতন ব্যক্তিরা চরম ক্ষোভ নিয়ে বলছেন "বৃষ্টি হলেই যেন নদী আসে আমাদের (গাইবান্ধা) শহরে"।

শহরের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে অনেক বাসিন্দাই দেখেন, পাড়ার অলিগলি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট পর্যন্ত পানি জমে ছোটখাটো নদীর মতো দৃশ্য ধারণ করেছে। কোথাও প্রায় হাঁটু পানি জমে জনজীবনে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।

সচেতন মহল, পথচারী-শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও শহরের স্থায়ী বাসিন্দাদের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি হলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশনের অভাবে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে ভোগান্তি বাড়ছে গাইবান্ধা পৌরবাসীর। এর ফলে শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষসহ সাধারণ জনগণকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

সরেজমিনে বুধবার (৮ জুন) দুপুরে গাইবান্ধা শহরের মাস্টার পাড়া, মুন্সি পাড়া ও খা পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে থেকে পাড়ার অলিগলি ও মূল সড়ক। পানিতে তলিয়ে যাওয়া এসব সড়কে চলতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। কেউ কাপড় ভিজিয়ে, কেউ কাপড় গুটিয়ে চলাচল করছেন। এ সময় জুতা হাতে নিয়ে চলাচল করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষকে।

এছাড়াও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের কাঁচারী বাজারের চুড়িপট্টি, সঁচীন চাকী সড়ক, ভিএইড রোডের কে.এন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনেসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট ও আবাসিক এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বাড়ির আঙিনাতে পানি প্রবেশ করেছে।

অন্যদিকে পানি নেমে যাওয়ার জন্য ড্রেনের ওপরের স্লাবের ঢাকনা মাঝে মাঝে খোলা থাকলেও তা দিয়ে সাভাবিক গতিতে পানি নেমে যেতে দেখা যায়নি। কোথাও কোথাও পানি নেমে যাওয়ার গতি থাকলেও তুলনামূলক কম সময়ে পানি নামতে পারেনি। কোথাও আবার ড্রেন উচুঁ, আবার কোথায় নিচু দেখা গেছে।

এর কারণ হিসেবে সচেতন নাগরিক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিক ড্রেন নির্মাণ, ড্রেনের জায়গা সংকট ও স্থানীয়দের অসচেতন হয়ে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলাই দায়ী।

সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সড়কের মধ্যপাড়ায় দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের গেট দিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের হয়েই জলাবদ্ধতার পানির মুখে পড়ছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এসময় অনেক শিক্ষার্থীকে জুতা হাতে নিয়ে চলতে দেখা যায়। একদিকে বৃষ্টি অন্যদিকে সড়কের পানি চরম ভোগান্তিতে ফেলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

ছাতা মাথায় গার্লস স্কুল রোডে হেটে চলা সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসরাফিল হোসেন আদিব বলেন, একদিকে বৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে রাস্তায় হাটু পানি। প্রাইভেটে যাচ্ছি রিকশা পাইনি। ১ টার সময় প্রাইভেট এখন সোয়া ১ টা বাজে, যেতে দেরি হয়ে গেলো। একটু ভারি বৃষ্টি হলেই এই রাস্তা পানিকে তলিয়ে যায়। একই কথা জানান এ পথের শিক্ষার্থী নাফিজ মন্ডল।

সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির এক নারী শিক্ষার্থীর বাবা ও দাঁড়িয়াপুর হাজী ওসমান গণি কলেজের শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক রেজা ঢাকা পোস্টকে বলেন, মেয়ের অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হবে। স্কুল গেটের পাশে সড়কে জলাবদ্ধতা, এটি শিক্ষার্থী-অভিভাবক এবং সর্বসাধরণের জন্য ভোগান্তি। এসব নিরসনে জরুরি এবং স্থায়ী পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার রোজী, একই ক্লাসের মিষ্টি খাতুন ও বৃষ্টি খাতুনকে ছাতা মাথায় হাটু পানিকে জুতা হাতে করে নিয়ে চলতে দেখা যায়।

তারা বলেন, আগামীকালও স্কুলে পরীক্ষা আছে। জুতা ভিজে গেলে কালতো পরে স্কুলে আসতে পারব না তাই হাতে করে নিয়ে যাচ্ছি।

জলাবদ্ধতার কবলে পড়া নাম-পরিচয়ে অনিচ্ছুক শহরের এক সচেতন নারী বাসিন্দা জানান, এসব বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় ময়লা-আবর্জনা পানিতে ভাসে। এসব নোংরা পানিতে বাধ্য আমাদের যাতায়াত করতে হয়। এগুলো সবার জন্য বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর।

সচেতন নাগরিক ও গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সাংগঠিন সম্পাদক রজতকান্তি বর্মন বলেন, বৃষ্টি হলেই আমাদের শহরে নদী আসে। পানিতে ভাসে শহরের পাড়া-মহল্লা। পৌরসভার উদাসিনতা ও যথাযথ দায়িত্বপালনের অভাবে এসব সৃষ্টি হয়। বর্ষায় প্রতিবছর অপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ ও  অব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

একই সাথে কিছুক্ষেত্রে ময়লা-আবর্জনা প্রশ্নে পৌরবাসির অসচেতনতাকেও দায়ী করেন তিনি।

শহরের বাসিন্দা গোলাম রব্বানি মুসা বলেন, পৌরসভার অপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণসহ জলাবদ্ধতার বড় কারণ জেলা শহরের সরকারি পুকুররগুলো দখল ও সরকারি- বেসরকারি পুকুরগুলো বিভিন্নভাবে ভরাট করা। এছাড়া পানি নিস্কাশনের মুখে বাধা সৃষ্টি করা। শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌরসভার পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। পৌরবাসিকে সচেতন করতে হবে। পানি প্রবাহের রাস্তাগুলো প্রশস্ত ও পরিস্কার রাখতে হবে। দখল হওয়া নালা, পুকুর উদ্ধার করে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু হানিফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের পাড়া-মহল্লার সংযোগ সড়ক এবং ড্রেনগুলো সরু। ফলে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয় তা ওই সরু ড্রেন দিয়ে নিষ্কাশন হতে পারে না। এতে ওভার ফ্লো হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া অনেক ড্রেনের পানি নামার স্থানে জাল ও বাঁশের বেড়া দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাও একটি কারণ বলে জানান তিনি।

এসময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের (পৌরসভার) জায়গা নেই বলে ড্রেনগুলো সরু হয়ে যায় । একই সাথে সড়ক বিভাগের করা শহরের প্রধান সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলো উঁচু হওয়াও পানি নিষ্কাশনের পথে বাধা বলেও জানান তিনি।

তবে, নতুন অর্থ বছরের একটি প্রকল্পে পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ হলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে বলে জানান এক কর্মকর্তা

মাসুম বিল্লাহ/এমটিআই

বিজ্ঞাপন