বিজ্ঞাপন

‘কোরআনের পাখি’ হওয়ার আগেই ঝরে যায় ৫ প্রাণ, বৃষ্টিভেজা শেষবিদায়

‘কোরআনের পাখি’ হওয়ার আগেই ঝরে যায় ৫ প্রাণ, বৃষ্টিভেজা শেষবিদায়

কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে নিহত পাঁচ শিক্ষার্থীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেই জানাজা শেষে তাদের কবরস্থ করা হয়। নিহতদের মধ্যে দুই বোনও রয়েছে, যাদের কোরআনের হাফেজ বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন বাবা। মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় আকস্মিক পাহাড়ধসে তাদের মৃত্যু হলে পুরো রোহিঙ্গা ক্যাম্পজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে মুষলধারে বৃষ্টির সময় অনুষ্ঠিত জানাজা শেষে ৩ ও ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ২টি কবরস্থানে নিহতদের দাফন করা হয়েছে।এরআগে, বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে মাদরাসাটির একটি শ্রেণিকক্ষের উপর আকস্মিক পাহাড় ধসে পড়ে মারা যায় শুক্কুরের এই দুই মেয়েসহ ৫ শিক্ষার্থী এবং আহত হয় ৮ জন।

জানা গেছে, রাখাইনের মংডুর থেকে কোনোরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে ২০১৭ সালের আগস্টে এক বৃষ্টির দিনে ছোট্ট দুই কন্যাশিশু উম্মে নাজাত ও উম্মে সালমাসহ পরিবারের ৬ সদস্য নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন রোহিঙ্গা যুবক আব্দুস শুক্কুর। গত ৯ বছর ধরে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ৩নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রিপলের ছাউনিতে অনিশ্চিত আশ্রয়জীবন কাটানো শুক্কুরের ইচ্ছা ছিল দুই মেয়েকে কোরআনের হাফেজ বানাবেন। এজন্য তিনি নাজাত ও সালমাকে সম্প্রতি ভর্তি করিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-৩ ব্লকে অবস্থিত মসজিদুল কুবা নারী মাদরাসা ও হেফজখানায়।

মেয়েদের অকালে হারিয়ে হতবিহবল পিতা আব্দুস শুক্কুর বলেন, দুই বোনকে একসাথে মাদরাসায় পাঠিয়েছিলাম। তারা ঘরে ফিরবে এবং একসাথে ভাত খাবো বলে অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ করে খবর পাই মাদরাসার উপর পাহাড় ধসে পড়েছে, সাথে সাথে সেখানে দৌঁড়ে গিয়ে দেখি নাজাত ও সালমার দেহ মাটির ভেতরে ঢুকে আছে। নাজাত ততক্ষণে দুনিয়ায় নেই, সালমার একটু নিশ্বাস ছিল মনে হয়েছে তবে হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার জানান সে মারা গেছে।

তিনি আরও বলেন, এটি আমার দেশ নয়, আমরা এখানে অতিথি মাত্র। এক বৃষ্টির দিনে আমার ছোট্ট বাচ্চাগুলোকে কোলে করে নিয়ে এখানে এসেছিলাম, বৃষ্টির দিনেই তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিল। ভেবেছিলাম শিগগিরই ৩০ পারা মুখস্থ করে আমার মেয়েরা কোরআনের পাখি হয়ে উঠবে। মনকে বুঝাতে পারছি না, সব আল্লাহর ইচ্ছা।

দুর্ঘটনার সময় মাদরাসার ভেতরে পাঠ করছিল অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী। সেই মুহূর্তের কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রাণে বেঁচে যাওয়া শিক্ষিকা বেগম জাহান।

তিনি বলেন, বাচ্চাদের কোরআন শরীফ পড়াচ্ছিলাম, বিকট শব্দে পাহাড়ধসে মাদরাসার দেয়াল আমাদের ওপর ধসে পড়ে। শিশুরা চিৎকার করতে করতে যে যেদিকে পেরেছে, সেদিকে দৌড়াতে শুরু করে। পশ্চিম পাশের দরজাটি খোলা থাকায় আমরা কয়েকজন বের হতে পেরেছিলাম, কিন্তু পূর্ব পাশে থাকা অনেক শিশু বের হওয়ার সুযোগ পায়নি। অথচ আর মাত্র কিছুক্ষণ পর মাদরাসা ছুটি হত।

নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে নাগরিক সংগঠন - আরকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিল (এআরএনসি)। 

বিবৃতিতে বলা হয়, পাহাড়ধসে ৫ শিক্ষার্থীসহ নিহত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর প্রতি এআরএনসি গভীর শোক জানাচ্ছে। আশ্রয়জীবনে এমন কঠিন মুহূর্ত হৃদয়বিদারক। আমরা আশা করছি, রোহিঙ্গা ভাইবোনেরা বৃষ্টির মৌসুমে নিজেদের নিরাপদে রাখবেন এবং সতর্ক থাকবেন।

ক্যাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, মাটি ভরাট করে পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত মাদরাসাটি রোহিঙ্গা হাফেজ ও তার স্ত্রী পরিচালনা করে আসছিলেন। ঘটনার পরপরই সব ক্যাম্পের মাদরাসা ও লার্নিং সেন্টারগুলো পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপতত বন্ধ থাকবে। তালিকা করে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে একই সাথে ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ.এন.এম সাজেদুর রহমান ৫নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে  দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। 

তিনি জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ উখিয়া উপজেলার দুর্ঘটনাপ্রবল এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চলমান বৈরী প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, চুরি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে সে লক্ষ্যে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত আছে।

প্রসঙ্গত, গত ৬ জুলাই (সোমবার) মধ্যরাতে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় নারী-শিশুসহ ৮ জন প্রাণ হারান। ভারীবর্ষণের প্রভাবে সবমিলিয়ে গত ৪ দিনে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ কক্সবাজারে ২২ জন মারা গেছেন।

ইফতিয়াজ নুর নিশান/এসএইচএ