প্রায় ৩০ বছর আগে প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অবহেলা ও অযত্নে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে টার্মিনাল ভবন। মূল্যবান অবকাঠামো ও সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এটি এখন বাসের গ্যারেজ ও যানবাহন মেরামতের স্থানে পরিণত হয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীরা।
স্থানীয় বাসমালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহর থেকে দূরে অবস্থান এবং টার্মিনাল এলাকায় পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় বাসমালিকরা এটি ব্যবহার করতে আগ্রহী নন। কয়েক দফা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা টেকসই হয়নি।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে রাজবাড়ী শহরের শ্রীপুর এলাকায় প্রায় ৪ একর ১৪ শতাংশ জমির ওপর ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৪ সালের ১৯ এপ্রিল তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগম এর উদ্বোধন করেন। পরে ২০০০ সালে টার্মিনালটি রাজবাড়ী পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কিছুদিন চালু থাকলেও ২০০৯ সালে আবার বন্ধ হয়ে যায়।
চুক্তি অনুযায়ী, নির্মাণ ব্যয়ের অর্থ ধাপে ধাপে জেলা পরিষদকে পরিশোধ করার কথা থাকলেও পৌরসভা এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। বর্তমানে জেলা পরিষদের পাওনা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অন্যদিকে পৌরসভা টার্মিনাল ইজারা এবং সংলগ্ন মার্কেট থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে।
রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পৌরসভার বন্দোবস্ত নিয়ে শহরের মুরগির ফার্ম এলাকায় বাস রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি বাস থেকে ৫০ টাকা করে পার্কিং ফি নেওয়া হয়। বাস টার্মিনাল ব্যবহারের জন্য সংগঠনটি পৌরসভার কাছ থেকে ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ টাকায় বন্দোবস্ত নিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালের মূল ভবন ও আশপাশের এলাকা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। যাত্রীদের জন্য নির্মিত অপেক্ষমাণ কক্ষের অধিকাংশ চেয়ার নাই। ভবনের দরজা-জানালা ভাঙা, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন কক্ষে যানবাহন মেরামতের যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে। আশপাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও পানি। টার্মিনাল ঘিরে গড়ে ওঠা বেশিরভাগ দোকানপাটও বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমানে রাজবাড়ী শহরের মুরগির ফার্ম, বড়পুল এবং জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের কার্যালয়ের সামনে মহাসড়ক থেকেই যাত্রী ওঠানামা করছে। এতে প্রায়ই যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল বিশ্বাস বলেন, মহাসড়কের ওপর বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত টার্মিনাল চালু করা হলে যাত্রী ও শহরবাসী উভয়ই উপকৃত হবে।
বাসচালক কৃষ্ণ হালদার বলেন, টার্মিনালটি চালু করতে হলে সব ধরনের বাসকে বাধ্যতামূলকভাবে সেখানে অবস্থান করতে হবে। বর্তমানে রাতে বাস রাখা হলেও সকালে সেগুলো শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী তোলে।
বাস সুপারভাইজার জামাল বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় টার্মিনালের ভবন নষ্ট হচ্ছে। এটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আবার চালু করা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা ছামাদ গাজী বলেন, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি ব্যবহার না হওয়া দুঃখজনক। দ্রুত এটি চালুর জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
পরিবহন শ্রমিক দুলাল বলেন, পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় সন্ধ্যার পর টার্মিনালটি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।
রাজবাড়ী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার ভৌমিক বলেন, টার্মিনালের প্রবেশপথ ও অবকাঠামো সংস্কার প্রয়োজন। মালিকপক্ষ টার্মিনাল চালুর বিষয়ে ইতোমধ্যে বৈঠক করেছে এবং দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক কল্যাণ চৌধুরী বলেন, জেলা পরিষদের বকেয়া অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হচ্ছে। বাস টার্মিনাল পুনরায় চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং শিগগিরই যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছরেও টার্মিনালটি কার্যকরভাবে চালু না হওয়ায় এটি এখন বাসের গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, জমিটির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে একাংশে বাস টার্মিনাল এবং অন্য অংশে এক হাজার আসনবিশিষ্ট জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম ও জেলা কালেক্টরেট স্কুল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অডিটোরিয়াম নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/এএমকে
