একসময় গ্রামবাংলার আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ আর তাতে শিল্পের ছোঁয়ায় ঝুলে থাকা বাবুই পাখির বাসা ছিল এক চিরচেনা দৃশ্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই স্মৃতির পাতায় বন্দি। তালগাছ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পী পাখি বাবুইয়ের ঠিকানাও যেন বদলে গেছে। প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে তারা এখন বেছে নিয়েছে নারিকেল গাছ, খেজুর গাছ ও আম গাছ।
এই পরিবর্তনের এক ব্যতিক্রমী ও মুগ্ধকর দৃশ্য দেখা গেছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার দয়ারামপুর ইউনিয়নের হিজলী পাবনাপাড়া গ্রামে। এখানকার হাড়িয়ার বিল-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা লুৎফর শেখের বাড়ির একটি নারিকেল গাছ, একটি খেজুর গাছ এবং অদূরের একটি আম গাছই এখন বাবুই পাখিদের অভয়ারণ্য।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পুরো উপজেলায় এই এলাকার কয়েকটি গাছ ছাড়া বাবুই পাখির বাসার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই প্রকৃতির এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন মানুষ।
সরেজমিনে হিজলী পাবনাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, লুৎফর শেখের বাড়ির নারিকেল গাছটি ছেয়ে গেছে বাবুই পাখির প্রায় অর্ধশত বাসায়। সড়কের পাশেই গাছটি হওয়ায় পথচলতি মানুষ যানবাহন থামিয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছেন এই দৃশ্য। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি তুলে ধরে রাখছেন বাবুইয়ের নতুন সংসারের এই মুহূর্ত।
এতকাল ধারনা ছিল বাবুই পাখির বাসা মানেই তালগাছ। প্রায় দুই মাস আগে যখন পাখিগুলো নারিকেল ও খেজুর গাছে বাসা বাঁধতে শুরু করে, তখন গ্রামের মানুষ অবাক হয়েছিলেন। এমনকি গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারাও জানান, জীবনে কখনো তারা নারিকেল, খেজুর গাছ বা আম গাছে বাবুই পাখির বাসা দেখেননি।
লুৎফর শেখের পুত্রবধূ নদীয়া আক্তার বলেন, আগে কখনো এ ধরনের বাসা দেখিনি। জানতাম বাবুই পাখি শুধু তালগাছেই বাসা বাঁধে। এখন দেখছি, নারিকেল গাছেও কত সুন্দর করে থাকছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ আসছেন এই বাসা দেখতে ও ছবি তুলতে।
ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা আলাউদ্দিন বলেন, বই-পুস্তকে পড়েছি, ইউটিউবে দেখেছি। কিন্তু নিজের এলাকায় এমন দৃশ্য এই প্রথম। পুরো উপজেলায় আর কোথাও বাবুই পাখির বাসা দেখিনি। পাখিগুলো এখানে নিরাপদেই আছে, আর পথচারীরাও অবাক হয়ে দেখছে।
উপজেলার জামনগর এলাকা থেকে বাবুই পাখির বাসা দেখতে আসা দর্শনার্থী রাজিবুল ইসলাম বলেন, অনেক দিন ধরেই কোথাও বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ে না। ফেসবুকে একজনের পোস্টে দেখে জানতে পারি, এখানে নারিকেল গাছে অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা রয়েছে। তাই খবর পেয়ে দেখতে এসেছি। নারিকেল গাছে ঝুলে থাকা এত সুন্দর ও সুনিপুণ বাসা দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ। স্মৃতি হিসেবে কয়েকটি ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মদল শেখ বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে পাখিগুলো এখানে বাসা তৈরি করেছে। তালগাছের বদলে নারিকেল, খেজুর ও আম গাছে বাসা বাঁধাটা আসলেই এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। আমার জানা মতে, বর্তমানে উপজেলার অন্য কোথাও বাবুই পাখির বাসা নেই। আমি স্থানীয় বাসিন্দাদের বাসাগুলো রক্ষা করার জন্য নজর রাখতে বলেছি।
পরিবেশের এই পরিবর্তনের কারণ ও বাবুই পাখির এমন আচরণের বিষয়ে জানতে চাইলে বাগাতিপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটি বাবুই পাখির অভিযোজন ক্ষমতার এক চমৎকার উদাহরণ। সময় ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেই তারা তালগাছের বিকল্প হিসেবে নারিকেল ও খেজুর গাছ বেছে নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমার অনুরোধ, কেউ যেন পাখিগুলোকে বিরক্ত না করেন বা তাদের বাসার কোনো ক্ষতি না করেন। সবাই মিলে সহযোগিতা করলে তারা নিরাপদে এখানে বংশবৃদ্ধি করতে পারবে এবং আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আশিকুর রহমান/এএমকে
