কলকাতা থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর। ভৌগোলিক অবস্থান, সহজ সড়ক যোগাযোগ এবং পদ্মা সেতুর সংযোগের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম সম্ভাবনাময় স্থলবন্দর হিসেবে বিবেচিত হয় এটি। সম্প্রতি ভোমরাকে কাস্টম হাউস হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে। গুঁড়াদুধ ছাড়া প্রায় সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এত সম্ভাবনার পরও বন্দরের বাস্তব চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। বরং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
ভোমরা কাস্টম হাউসের জনপ্রশাসন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্ধারিত সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। কিন্তু বছর শেষে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ১১৪ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার ৬৫৮ টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৫০ কোটি ৬৯ লাখ ১৯ হাজার টাকা।
শুধু রাজস্ব নয়, আগের অর্থবছরের তুলনায় বন্দরের বাণিজ্য কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কাস্টমস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলার সংকট, এলসি (ঋণপত্র) খোলার জটিলতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে টানাপোড়েনের কারণে আমদানি-রপ্তানি কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে।
দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও ভোমরা বন্দরের বড় সমস্যা। ১৯৯৬ সালের ১৫ এপ্রিল যাত্রা শুরু করা বন্দরটি ২০১৩ সালে ওয়্যারহাউজ নির্মাণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরের মর্যাদা পেলেও এখনো আন্তর্জাতিক মানের কার্গো শেড, পর্যাপ্ত ট্রাক টার্মিনাল, প্রশস্ত সড়ক, আধুনিক স্ক্যানার এবং পণ্য পরীক্ষার ল্যাবরেটরিসহ প্রয়োজনীয় অনেক সুবিধার অভাব রয়েছে। ফলে বন্দরের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাই নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, ডলারের সংকট এবং এলসি খোলার জটিলতায় অনেক আমদানিকারক নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে আমদানি-রপ্তানি কমে গিয়ে রাজস্ব আদায়ও কমে এসেছে।
ভোমরা কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুছা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বহুমুখী সমস্যার কারণে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ব্যবসা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব খাতে। এই বড় ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হলে এখন সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
ভোমরা কাস্টম হাউসের কমিশনার মুশফিকুর রহমান বলেন, বিশাল এই রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নতুন রাজস্ব আহরণ কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। নতুন বাজেটের আওতায় ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগের পাশাপাশি রাজস্ব বাড়াতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোমরা স্থলবন্দর শুধু সাতক্ষীরা নয়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, আমদানি-রপ্তানিবান্ধব নীতিমালা এবং আর্থিক সংকট নিরসন করা গেলে এই বন্দর আবারও রাজস্ব আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই বন্দরের সক্ষমতা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইব্রাহিম খলিল/এএমকে
