নরসিংদীর আদালত প্রাঙ্গণ থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে জিম্মি রাখার পর মারধর ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর মাসুদ রানা বাবুলকে প্রধান আসামি করে ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী। মামলার এজাহারে ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী লিখন তালুকদার ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার গোবিন্দপুরের বাসিন্দা এবং ঢাকা একটি কনসালটেন্সি ফার্ম-এর ব্যবসা করেন।
মামলার আসামিরা হলেন- নরসিংদীর হাজীপুর ইউনিয়নের চকপাড়া গ্রামের সামাদ সরকারের ছেলে মাসুদ রানা বাবুল ওরফে কনটেন্ট কিয়েটর বাবুল ৫৫), তার ভাই কামাল সরকার (৪৯), বদরপুর গ্রামের হাসিম ভূইয়া ছেলে কামাল ভূইয়া (৪৭), নরসিংদী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক আবু হানিফ সজিব (৩৮), বিলাসদী এলাকার ইনসান (৪০) ও শরীফ (৩৮), শিবপুরের পুটিয়া গ্রামের আবদুল মান্নানের ছেলে মোশারফ হোসেন (৪৯)।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বুধবার দুপুরে চেক সংক্রান্ত একটি মামলায় হাজিরা দিতে নরসিংদী আদালতে আসেন লিখন তালুকদার ও তার বন্ধু শাকিল খান। হাজিরা শেষে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়ার সময় মাসুদ রানা বাবুলের নেতৃত্বে কয়েকজন তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখে।
ব্যবসায়ী লিখন বলেন, সেখানে তাকে নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত মারধর করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে স্ত্রী সায়মা শাহীন রিয়াকে ফোন করে বীভৎস নির্যাতনের শব্দ শোনানো হয় এবং টাকা না দিলে তাকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামীকে রক্ষায় বাধ্য হয়ে তার স্ত্রী রিয়া নিজের ব্যাংক হিসাব থেকে অপহরণ চক্রের প্রধান মাসুদ রানা বাবুলের দেওয়া ৬টি বিকাশ নম্বরে এক লাখ ১৮ হাজার টাকা পাঠান। টাকা পাওয়ার পর অভিযুক্তরা তাকে ছেড়ে দেয় এবং বিষয়টি পুলিশকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী আরও জানান, মুক্তি পাওয়ার পর তিনি নরসিংদী সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় অভিযুক্তদের পরিচয় সংগ্রহ করে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।
ভুক্তভোগীর বন্ধু সাকিল খান বলেন, চেক-সংক্রান্ত একটি মামলার হাজিরা দিতে আমি আমার বন্ধু লিখনের সঙ্গে নরসিংদী আদালতে গিয়েছিলাম। হাজিরা শেষে ম্যাজিস্ট্রেটের কক্ষের গেট থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন ব্যক্তি আমাদের ঘিরে ধরে। তাদের মধ্যে বাবুল নামে একজন ছিলেন। এছাড়া ইনসাফ, শরিফসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। তারা আমার বন্ধুকে দুই পাশ থেকে ধরে জোরপূর্বক টানাহেঁচড়া করতে থাকে এবং বলতে থাকে, সিএনজি রেডি কর। বাবুল নামে ওই ব্যক্তির গলায় অপরাধ কণ্ঠ লেখা একটি পরিচয়পত্র ছিল এবং তার হাতে এশিয়া টিভি লেখা একটি লোগোযুক্ত মাইক্রোফোন ছিল। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই।
জানা গেছে, চক্রের প্রধান দীর্ঘদিন ধরে মাসুদ রানা বাবুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধ কণ্ঠ, নরসিংদী পোস্ট, জনসংবাদ টিভি নামসহ আইডি খুলে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষদের হয়রানি ও ব্লাকমেইলিং এর মাধ্যমে টাকা আদায় করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে নরসিংদীর বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, অপহরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে হয়রানিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি নিজেকে মাদকবিরোধী আন্দোলনের নরসিংদী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, অনুমোদনহীন ও ভুঁইফোঁড় এই সংগঠনের নাম ব্যবহার করে মাসুদ রানা বাবুল কথিত মাদক সিন্ডিকেটের কাছ থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা মাসোহারা আদায় করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১২ সাল থেকে তার নেতৃত্বে নরসিংদীতে একটি সংঘবদ্ধ হানি ট্র্যাপ চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই হানি ট্র্যাপ চক্রের ফাঁদে নরসিংদীর শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, প্রকৌশলী, কলেজের অধ্যক্ষ, শিক্ষক নেতা, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পড়েছেন। আদায়কৃত অর্থের ৭০ শতাংশ ওই চক্র প্রধান এবং ৩০ শতাংশ মাসুদ রানা বাবুল গ্রহণ করতেন।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মাসুদ রানা বাবুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করে ও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
নরসিংদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ এ আর এম আল মামুন বলেন, লিখিত অভিযোগের বিরুদ্ধে ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
নরসিংদীর পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। এ ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমিনুর রহমান সাদী/এসএইচএ
