বিজ্ঞাপন

ভোরে জমে ওঠে রাজবাড়ীর শ্রমিক হাট, কাজের অপেক্ষায় শত দিনমজুর

ভোরে জমে ওঠে রাজবাড়ীর শ্রমিক হাট, কাজের অপেক্ষায় শত দিনমজুর

ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজবাড়ী রেলস্টেশন চত্বরে জড়ো হতে শুরু করেন শতাধিক দিনমজুর। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে কাস্তে, আবার কেউ খালি হাতেই বসে থাকেন। সবার একটাই আশা কোনো গৃহস্থ বা ঠিকাদার এসে দিনের কাজের জন্য তাকে বেছে নেবেন। স্থানীয়দের কাছে বহু বছরের এই সমাগম পরিচিত ‘শ্রমিকের হাট’ নামে।

প্রতিদিন সকাল থেকেই ধান রোপণ, পাট কাটা, নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন মৌসুমি শ্রমের জন্য এখানে শ্রমিক ও নিয়োগদাতাদের ভিড় জমে। শুধু রাজবাড়ী নয়, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকেও শ্রমিকরা কাজের আশায় এখানে এসে অপেক্ষা করেন।

শ্রমিকদের ভাষ্য, প্রতিদিন কাজ মেলে না। কাজ পেলে দিনের মজুরিতে কোনোমতে সংসার চলে, আর কাজ না পেলে পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় কাটে দিন। বর্তমানে কাজের ধরন অনুযায়ী দৈনিক ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি মিললেও চূড়ান্ত পারিশ্রমিক নির্ধারণ হয় দরদামের ভিত্তিতে।

শ্রমিক রহিম শেখ বলেন, সকাল থেকে বসে থাকি। ভাগ্য ভালো হলে কাজ পাই, না হলে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয়। বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে, তাই কাজ না থাকলে সংসার চালানো খুব কষ্ট।

কুষ্টিয়া থেকে আসা শ্রমিক মোস্তাক মণ্ডল জানান, প্রায় এক মাস ধরে তিনি রাজবাড়ীতে রয়েছেন। তিনি বলেন, পাট কাটার মৌসুমে কাজের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মজুরি পাই, সঙ্গে তিন বেলা খাবারও দেয়। তবে কাজ না থাকলে নিজেদের টাকায় চলতে হয়। রাতে স্টেশনেই থাকি। এখানে একটি পাবলিক টয়লেট খুব প্রয়োজন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শ্রমিক দিদারুল ইসলাম বলেন, রাতে স্টেশনেই থাকি। কাজ পেলে মালিকের বাড়িতে চলে যাই। তবে সবসময় কাজ পাওয়া যায় না।

আরেক শ্রমিক সবুজ ব্যাপারী বলেন, আমরা দিনমজুর। কাজ পেলে পেট চলে, না পেলে না খেয়ে থাকতে হয়। হোটেলে থাকার সামর্থ্য নেই, তাই স্টেশনেই রাত কাটাই। এখানে শৌচাগারের বড় সংকট। সরকার একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করলে অনেক উপকার হতো।

গৃহস্থ রফিকুল ইসলাম বলেন, মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা বেশি থাকে। তাই ভোরেই এসে শ্রমিক নিয়ে যেতে হয়। দক্ষ শ্রমিক পেলে কাজও ভালো হয়।

আরেক গৃহস্থ আজিবর ব্যাপারী জানান, দুই বিঘা জমিতে পাট লাগিয়েছি। এখন পাট কাটার সময়, তাই শ্রমিক নিতে এসেছি। তবে গত বছরের তুলনায় এবার শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে।

স্থানীয়দের মতে, বহু বছর ধরে রাজবাড়ী রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে এই শ্রমিকের হাট গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন এখান থেকে রাজবাড়ী ছাড়াও ফরিদপুর, মানিকগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা কাজে যান।

শ্রমিকদের দাবি, নিয়মিত কাজের সুযোগ, ন্যায্য মজুরি এবং যাতায়াত ও বিশ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে তাদের জীবন-জীবিকা আরও নিরাপদ হবে। তাদের মতে, এই শ্রমিকের হাট এখন শুধু শ্রম বিক্রির স্থান নয়, বরং হাজারো নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকার অন্যতম ভরসা।

রাজবাড়ী রেলওয়ের সহকারী স্টেশন মাস্টার আব্দুর রহমান বলেন, রাজবাড়ী রেলস্টেশনের সামনে প্রতিদিনই শ্রমিকের হাট বসে। এসব শ্রমিকের বেশির ভাগই উত্তরাঞ্চল থেকে আসেন। তারা রাতে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, হলরুম ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করেন। স্টেশন চত্বরে থাকার বৈধতা না থাকলেও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের থাকতে দেওয়া হয়। তবে তাদের জন্য একটি পাবলিক টয়লেট স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।

মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/আরকে

বিজ্ঞাপন