বিজ্ঞাপন

অর্ধেকের বেশি শিক্ষক অনুপস্থিত

‘সরকারের একদম লস প্রজেক্ট এই স্কুলগুলো’, বলছেন অভিভাবকরা

‘সরকারের একদম লস প্রজেক্ট এই স্কুলগুলো’, বলছেন অভিভাবকরা

‘সরকারের একদম লস প্রজেক্ট এই স্কুলগুলো’- নরসিংদীর চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে এমনই হতাশাজনক মন্তব্য করেছেন স্থানীয় অভিভাবকরা। তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদায়ন থাকলেও নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না শিক্ষকরা। ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অনিয়মে চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার মান অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অভিভাবক ও এলাকাবাসী।

অভিযোগ রয়েছে, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক পাচ্ছে না। কোথাও পাঁচজন শিক্ষক পদায়ন থাকলেও পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন মাত্র একজন শিক্ষক, বাকি শিক্ষকরা থাকছেন অনুপস্থিত। সরকার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করলেও বেশিরভাগ শিক্ষক দায়িত্ব পালনে উদাসীন। এতে অনেক শিশুর পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, শিক্ষক সংকট ও অনিয়মের কারণে চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার মান দিন দিন নিম্নমুখী হচ্ছে।

অন্যদিকে, শিক্ষকদের অনুপস্থিতির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের কার্যকর তদারকি ও উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সম্প্রতি সরেজমিনে সদর উপজেলার চরদিঘলদী ইউনিয়নের চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে শিক্ষকদের উপস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। পরিদর্শনের সময় অধিকাংশ বিদ্যালয়েই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক অনুপস্থিত ছিলেন।

নোয়াবপুর-নোয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক রয়েছেন ৪ জন। এর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ২ জন এবং অনুপস্থিত ছিলেন ২ জন। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৩২ জন।

দোয়ানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৪ জন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ২ জন এবং অনুপস্থিত ছিলেন ২ জন। অনুপস্থিত শিক্ষকদের একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩২০ জন।

চরদিঘলদী ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৪ জন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র একজন, আর অনুপস্থিত ছিলেন ৩ জন। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৬৬ জন।

চরদিঘলদী ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৫ জন শিক্ষকের বিপরীতে উপস্থিত ছিলেন ২ জন এবং অনুপস্থিত ছিলেন ৩ জন। অনুপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যে একজন সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ১৭৮ জন।

পরিদর্শনকৃত চারটি বিদ্যালয়ে মোট ১৭ জন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৭ জন, আর অনুপস্থিত ছিলেন ১০ জন। অর্থাৎ, মোট শিক্ষকের অর্ধেকেরও বেশি অনুপস্থিত থাকার চিত্র দেখা গেছে। এতে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা গ্রহণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলার কথা থাকলেও অনেক শিক্ষক বেলা ১১টা বা ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন এবং দুপুর দেড়টার মধ্যেই চলে যান। এছাড়া কিছু বিদ্যালয়ে বিকল্প হিসেবে খণ্ডকালীন ব্যক্তি বা দপ্তরিকে দিয়ে শ্রেণি পরিচালনার অভিযোগও করেন তারা।

পঞ্চম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, তারা অনেক সময় দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে আসে এবং এক ঘণ্টার মধ্যেই ছুটি হয়ে যায়। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আমানুল্লাহ চরদিঘলদী ইউনিয়নের দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়েই অভিযোগ করে বলেন, এই স্কুলে শিক্ষক যে কে সেটাই জানি না। তাদের দেখিই না। মাঝে মধ্যে প্রধান শিক্ষক আসে, তা ছাড়া অন্যান্য শিক্ষকদের উপস্থিতিও দেখি না, ক্লাসও করাতে দেখি না। সরকারের একদম লস প্রজেক্ট এই স্কুলগুলো। মাঝে মধ্যে দুই থেকে একজন শিক্ষক আছে, ১টা-২টা ক্লাস করিয়ে চলে যায়। চরদিঘলদী ইউনিয়ন এই শিক্ষার কারণে ১০০ বছর পিছিয়ে রয়েছি। আমি মনে করি শিক্ষকরা যদি সঠিক সময়ে স্কুলে আসে, ঠিকমতো ক্লাস করায়, তাহলে শিক্ষার মান ভালো হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা আহসান হাবিব লিটন বলেন, তারা নৌকার অজুহাত দেখিয়ে ১১টায় আসে, আবার ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে চলে যায়। কোনো দিনই সব শিক্ষক একসঙ্গে উপস্থিত থাকে না। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস করায় না, আর শিক্ষার মান তো নেই-ই। আমরা কখনো দুপুরের পর স্কুল খোলা দেখি না। কখনো কখনো শিক্ষকরা আড্ডা দিয়েই চলে যায়, ক্লাস করায় না।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, দুই থেকে একজন শিক্ষক মিলে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে টাকা তুলে ভাড়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেয়। তারাই মাঝে মধ্যে ক্লাস নেয়।

এ বিষয়ে সত্যতা যাচাই করতে চরদিঘলদী ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে বৃহস্পতিবারের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। প্রথমে তিনি দাবি করেন, ওই দিন বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। তবে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে হাজিরা খাতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে প্রকৃত তথ্য জানান।

তিনি বলেন, আমার স্কুলে ৫ জন শিক্ষক রয়েছে। একজন সাময়িক বরখাস্ত, একজন ট্রেনিংয়ে আছে আর ২ জন অনুপস্থিত রয়েছে।

চরদিঘলদী ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও উপস্থিত ছিলেন মাত্র একজন। এ বিষয়ে কোনো সরকারি ছুটি নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনজু মিয়া বলেন, স্কুলের শিক্ষা উপকরণ নেওয়ার জন্য বাইরে এসেছি। আর সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সমস্যা ছিল, তিনি আমাকে বলেই চলে গেছেন।

এছাড়া স্থানীয় ও অভিভাবকদের অভিযোগ অস্বীকার করে দোয়ানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোজিনা আক্তার বলেন, তারা মিথ্যা বললে তো আমরা কিছু করতে পারি না। আপনারা আমাদের অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেন। নরসিংদী থেকে সব শিক্ষক আসে, অনেক সময় লাগে স্কুলে আসতে।

নোয়াবপুর-নোয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম শিক্ষক অনুপস্থিতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটি নদীবেষ্টিত ও প্রত্যন্ত এলাকা। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও জানে। নৌপথে যাতায়াতের কারণে অনেক সময় নৌকা ভিড়তে দেরি হয়, তাই পৌঁছাতেও কিছুটা বিলম্ব ঘটে।

চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক উপস্থিত না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হলেও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী হাবিবার বাবা আজিজুল বলেন, শিক্ষকরা ১২টার দিকে চলে যায়। সবাই ঠিকমতো আসে না, একেকদিন একেকজন আসে। লেখাপড়ার মান খুব বাজে হয়ে গেছে। একটা ৫ম শ্রেণির ছাএকে জিজ্ঞেস করলে তারা কিছু পারবে না। কারণ হলো শিক্ষা বলতে কিছু নাই এই স্কুলে। ২০১৮ সালের দিলে স্কুলগুলো ভালো ছিল শিক্ষার্থী ছিল অনেক, শিক্ষকরা ও ঠিকমতো স্কুলে আসতো এখন একদম খারাপ অবস্থা। 

শিক্ষক অনুপস্থিত ও দেরি করে স্কুলে যাওয়ার ব্যপারে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শফিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক স্কুলে দেরি করে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমার কাছে কিছু তথ্য আসছে নানা জায়গা থেকে। আমরা চেষ্টা করছি, আপনাদের সহযোগিতা চাই। আর স্কুলে শিক্ষক সংকটও রয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিরঞ্জন কুমার রায় বলেন, আমাদের শিক্ষক সংকট রয়েছে। যে স্কুলে কম শিক্ষক রয়েছে, সেই স্কুলগুলোতে শিক্ষক দেওয়ার চেষ্টা করছি। 

কিছু বিদ্যালয়ে ৪ থেকে ৫ জন শিক্ষক থাকার পরও মাত্র একজন উপস্থিত থাকেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা বিষয়গুলো মনিটরিং করেন। তবে আমি অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

আরকে

বিজ্ঞাপন