গাইবান্ধার ফুলছড়িতে প্রায় ২৯ লাখ টাকার নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জিও ব্যাগের মান ও বালুর পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ তদন্তে মাঠে নেমেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ রসুলপুর (বালাসীঘাটের দক্ষিণে) এলাকায় ভাঙনকবলিত স্থান পরিদর্শনে গিয়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেস উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত তিন সপ্তাহে দক্ষিণ রসুলপুর এলাকায় ভিটেমাটিসহ অন্তত ৫০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) থেকে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করে গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে, সেখানে কাজ শুরুর দিন থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যবহৃত জিও ব্যাগের মান নিম্নমানের, বালুর সঙ্গে মাটি মিশ্রণ করা হচ্ছে এবং বস্তায় নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম বালু দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় আজ দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেস এবং জামায়াতের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। পরিদর্শনের সময় কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মিলনসহ তার সমর্থকদের সঙ্গে জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি কিছু সময়ের জন্য থমথমে হয়ে ওঠে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, শুক্রবার দুপুরে এমপি আব্দুল ওয়ারেস ও জামায়াতের স্থানীয় নেতারা কাজ পরিদর্শনে গিয়ে জিও ব্যাগের মান, বালুর মান ও ওজনে অসঙ্গতি দেখতে পান। পরে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়। এ সময় কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিলন ও তার সমর্থকদের সঙ্গে জামায়াত নেতাকর্মীদের বাগবিতণ্ডা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
এদিকে ঘটনার পর নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে ফেসবুকে একাধিক পোস্ট করতে দেখা যায়। সেখানকার জামায়াত নেতার ফেসবুক পোস্টে এমপি ওয়ারেসকে মোবাইল ফোনে কাজের অনিয়ম তুলে কারো সাথে কথা বলতে শোনা যায়। সেখানে মিলনকে দিয়ে কাজ করানোর বিষয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি দেশের অন্যায় করছে, জনগণের ক্ষতি করছে, তাকে আবার জনগণের সেবা করার কাজ দিয়েছেন বলেও আক্ষেপ করেন তিনি।
ঘটনার পর উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের ফেসবুকেও একাধিক পোস্ট দিতে দেখা যায়। জামায়াতের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, বালাসী এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকেই ভাঙনরোধের কাজ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, জামায়াত নেতারা কাজ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন।
জামায়াত নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বালাসীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে সেখানে ভাঙন হচ্ছে। অথচ যে ব্যক্তি বালু তুলেছেন, পাউবো তাকেই কাজ দিয়েছেন। অন্যদিকে, অপর একটি পোস্টে নদী ভাঙনে জিও ব্যাগ ডাম্পিং কাজ বন্ধ করতে জামায়াত নেতারা পাঁয়তারা করছেন বলে অভিযোগ তোলা হয়। ডাম্পিংয়ের কাজের লোকদের তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজেরও অভিযোগ করা হয় ওই পোস্টে।
এব্যাপারে মন্তব্য জানতে কয়েক দফায় ফোন করলেও ফোন রিসিভ করেননি এমপি আব্দুল ওয়ারেস। তবে, পরে কল ব্যাক করে তিনি রংপুরে মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
ফুলছড়ি ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি নূর আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে তারা কাজের মান দেখতে যান। সেখানে গিয়ে নিম্নমানের জিও ব্যাগ, মাটি মেশানো বালু ও কম ওজনের বস্তা দেখতে পান। অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরতেই বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
তিনি আরও বলেন, কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের অনিয়মের অভিযোগে আজ সেখানে পরিদর্শনে যান গাইবান্ধা-৫ আসনের এমপি আব্দুল ওয়ারেস। সেখানে গিয়ে এমপি মহোদয় জিও ব্যাগের মান খারাপ, মাটি মিশ্রিত বালু আর বস্তা ওজন করে বালু কম দেখতে পান। পরে বিষয়টি তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্টদের অবগত করা হয়। অনিয়মের প্রশ্ন তোলাতেই বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বিএনপির লোকজন আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত হন।
অন্যদিকে কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিলন বলেন, তিনি কোনো ঠিকাদার নন। জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও পাউবোর কর্মকর্তাদের অনুরোধে ভাঙনরোধের কাজে সহযোগিতা করছেন। তার দাবি, জামায়াত নেতারা কাজে বাধা দিয়েছেন এবং শ্রমিকদের সঙ্গে অসদাচরণ করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কাজের ভাগ নেওয়া। তারা ভেবেছে এটি ঠিকাদারি কাজ। পরে স্থানীয়দের ধাওয়ায় এমপি দৌড়ে পালিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বৃষ্টির কারণে যখন বালু পাচ্ছিল না, কাজ করতে পারছিল না তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা আমাকে অনুরোধ করেন। আমি অন্য এক ঠিকাদারের বস্তা ধার নিয়ে দিয়েছি, বালু সংগ্রহ করেছি। সেখানে এতো হিসেব-পাতি কেন?
গাইবান্ধা পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী (এসও) আব্দুল বারী বলেন, এমপি ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। তবে বর্তমানে কাজ সঠিকভাবেই চলছে বলে দাবি করেন তিনি।
ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, নদীভাঙন রোধের সব কাজই পানি উন্নয়ন বোর্ড বাস্তবায়ন করে। উপজেলা প্রশাসন কাউকে এ ধরনের কাজে নিয়োগ দেয় না। অনিয়মের অভিযোগ পেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, কাজের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তে ইতোমধ্যে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে (এসডিই) পাঠানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, কাজের দায়িত্ব ঠিকাদারের, পাউবো কোনো ব্যক্তিকে আলাদাভাবে কাজের দায়িত্ব দেয় না।
এসময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কাউকে কাজের জন্য অনুরোধ করি না। কাজের দায়িত্ব ঠিকাদারের, আমরা ঠিকাদারকে কাজের দায়িত্ব দিয়েছি। ঠিকাদার কিভাবে কাজ করবে সেটি তাদের বিষয়।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র ভাঙনে দক্ষিণ রসুলপুর এলাকায় বসতভিটা, গাছপালা ও প্রায় ৫০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। পরে প্রায় ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ৬ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের জরুরি কাজ শুরু করে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড। কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে সোবহান এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
মাসুম বিল্লাহ/এসএইচএ
