মাগুরার শালিখা উপজেলায় স্বীকৃতি, সাইনবোর্ড কিংবা দৃশ্যমান শিক্ষা কার্যক্রমবিহীন একটি কলেজের নামে ভবন নির্মাণে দেড় কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে কলেজটির কার্যক্রম নেই বললেই চলে। অথচ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।
জানা গেছে, গত অর্থবছরের শেষ দিকে ২১ জুন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর মাগুরার দুই সংসদীয় আসনের ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দেড় কোটি টাকা করে মোট ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এরই অংশ হিসেবে শালিখা উপজেলার মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনের নকশা অনুমোদনের লক্ষ্যে মাটি পরীক্ষার কাজও শুরু করেছে মাগুরা শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শালিখা উপজেলায় মুন্সী শহিদুর রহমান বিএম কলেজ নামে কোনো এমপিওভুক্ত বা স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির কোনো সাইনবোর্ড বা নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমেরও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কোথাও এ নামে কোনো স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। তবে আড়পাড়া ইউনিয়নের চুকিনগর গ্রামে একই নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রয়াত ইউপি চেয়ারম্যান মুন্সী শহিদুর রহমানের নামে তার ছেলে মুন্সী কামরুজ্জামান নবাব ২০১৮ সালের দিকে প্রায় ৫০ শতাংশ জমির ওপর দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করে কলেজ চালুর উদ্যোগ নেন। শুরুতে হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী এলেও অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চুকিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপরীতে একটি ধানচাতালের পাশে দুটি জরাজীর্ণ টিনশেড ঘর দাঁড়িয়ে আছে। নেই কোনো সাইনবোর্ড, নেই শিক্ষার্থী কিংবা শ্রেণিকক্ষের কোনো কার্যক্রম। চারপাশ আগাছায় ভরা, ভবনের ভেতরে উপজেলা পরিষদ থেকে দেওয়া কয়েকটি নতুন বেঞ্চ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেকে অধ্যক্ষ পরিচয় দিয়ে মুন্সী কামরুজ্জামান নবাব শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের নামে অন্তত ১৫ জনের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে আদায় করেন। চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত বেতন-ভাতার আশ্বাস দেওয়া হলেও কেউই বেতন পাননি। ২০২০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে নিয়োগপ্রাপ্তরা টাকা ফেরত চাইলে তাও পাননি। পরে জীবিকার তাগিদে অনেকে চায়ের দোকান, ডিমের ব্যবসা, বিউটি পার্লারসহ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুন্সী কামরুজ্জামান নবাব। তার দাবি, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের সরকারি অনুমতি না থাকায় খণ্ডকালীন শিক্ষক নেওয়া হয়েছিল। টাকার বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগও তিনি নাকচ করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, দুটি শিফটে পাঠদান চলছে এবং চলতি বছর ৭০ জন শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
তবে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হোসনে মোবারক জানান চলতি বছরে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম না থাকলেও কাগজে কলমে তারা কার্যক্রম চলমান দেখাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর ডিও লেটারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির নামে দেড় কোটি টাকার বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে মাগুরা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সরকার হারুন অর রশিদ বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করেছে। আমাদের ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে জরিপ প্রতিবেদন এবং ১৫ আগস্টের মধ্যে মাটি পরীক্ষাসহ নকশা অনুমোদনের কাগজপত্র পাঠাতে বলা হয়েছে। জরিপে যে তথ্য পাওয়া যাবে, সেটিই অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত সেখান থেকেই নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, ওই প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত নয়। তবে ৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দের বিষয়ে আমি বলতে পারি না, করণ বরাদ্দ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও কার্যক্রম নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়েছে, সেখানে কীভাবে সেই প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ অনুমোদন পেল—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাছিন জামান/এসএইচএ
