রংপুরের প্রবীণ সাংবাদিক ও প্রথম খবর পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবলা ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শনিবার (১১ জুলাই) সকাল ৯টার দিকে ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর বয়স। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।
তৌহিদুল ইসলাম বাবলার মৃত্যুতে রংপুরের সাংবাদিক সমাজে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মরহুমের জানাজা আজ বাদ এশা নগরীর সেনপাড়া জামে মসজিদ এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘ চার দশক ধরে তৌহিদুল ইসলাম বাবলা সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংবাদিকতা পেশায় দায়িত্ব পালন করেন। তার মৃত্যুতে বিভিন্ন সাংবাদিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
তৌহিদুল ইসলাম বাবলা ছিলেন একজন প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক। দীর্ঘ সময় ধরেই সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে নিজেকে একজন দক্ষ ও প্রবীণ সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। রংপুরে তিনি বাবলা নামেই সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রথম খবর পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে রংপুর বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রিপোর্টার্স ক্লাব রংপুর প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা ও ফোরামের সাথে যুক্ত ছিলেন।
তৌহিদুল ইসলাম বাবলা ১৯৬৩ সালের ১০ আগস্ট নীলফামারী মহকুমার কিশোরীগঞ্জ থানার বড়ভিটার মেলাবড় গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলীম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম মমতাজুল হক প্রামাণিক, মাতা মরহুমা আলেয়া বেগম। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ।
নানার পুত্র সন্তান না থাকায় শিশুকাল বেড়ে উঠা নানাবাড়ি নীলফামারী মহকুমার পলাশবাড়ি ইউনিয়নের কানাইকাটা গ্রামে। ওই ইউনিয়নের খলিশাপচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৭৩ সালে রংপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র সেনপাড়ায় পিতা-মাতার কাছে চলেন আসেন।
ওই বছরেই তিনি রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭৮-৭৯ শিক্ষাবর্ষে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে পারিবারিক কারণে ১৯৮১ সালে সোনালী ব্যাংকে চাকরিতে যোগদান করেন। ওই বছরেই তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
ব্যাংকে তার চাকরি জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৮২ সালের শেষ দিকে সোনালী ব্যাংক গঙ্গাচড়া শাখায় কর্মরত থাকাকালীন বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে দেশব্যাপী সংযুক্ত ‘ব্যাংক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন’ এর আন্দোলন শুরু হলে বাবলাও এ আন্দোলনে যোগ দিয়ে ধর্মঘটে অংশ নেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ২৪ ঘণ্টার নোটিশে তাকেসহ একযোগে ২২ হাজার ব্যাংক কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেন।
বিবাহিত জীবনে তিনি ২ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানের জনক। সোনালী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হয়ে তিনি প্রাইভেট টিউশন শুরু করেন। এর পাশাপাশি থেমে যাওয়া পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গাইবান্ধা সরকারি কলেজে স্নাতকে ভর্তি হন। একই সময়ে তিনি টিউশনির সাথে সাথে রংপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ভাষাসৈনিক অধ্যাপক নূরুল ইসলাম স্যারের মালিকানাধীন নিপুণ প্রেসে মুদ্রণ-শিল্পে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি মুদ্রণ জগতে জীবিকার লড়াইয়ের পাশপাশি রংপুরে প্রেস শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন এবং দাবি আদায়সহ রংপুরের অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন জোরদারে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি গণসংহতি আন্দোলন-জিএসএ’র রংপুর মহানগরের সদস্য সচিব হিসেবে পদে ছিলেন।
জীবিকা অর্জনের টানা-পোড়েনের কারণেই তিনি ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অবস্থানরত প্রতিথযশা সাংবাদিক রংপুরের সন্তান শেখ কল্লোল আহমেদের শরণাপন্ন হন। তার হাত ধরে ‘সাপ্তাহিক খবরের কাগজ’-এ প্রুফ রিডার পদে যোগদান করেন। সেখানে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। এরপর পর্যায়ক্রমে একই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘দৈনিক আজকের কাগজ’-এ জুনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে ১৯৯০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’-এ স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি ‘দৈনিক লালসবুজ’ পত্রিকায় পর্যায়ক্রমে চিফ রিপোর্টার ও শিফট ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে ‘সংবাদ সংস্থা মিডিয়া সিন্ডিকেট’-এ ১৯৯৮ থেকে ২০০০ পর্যন্ত বিশেষ প্রতিবেদকের দায়িত্ব পালন করেন।
২০০০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা থেকে রংপুরে ফিরে আসেন তিনি। এরপর থেকেই তিনি পর্যায়ক্রমে বার্তা সম্পাদক হিসেবে রংপুরের স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক রংপুর, দৈনিক দাবানল, দৈনিক প্রথম খবর, দৈনিক বাহের সংবাদ এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘সংবাদ প্রতিদিন’ এর রংপুর বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষ তিনি স্থানীয় দৈনিক প্রথম খবরের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সাংবাদিকতা করেন।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর
