বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলে মন্তব্য করেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন বহাল থাকলে তাদের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু হবে না। এমন পরিস্থিতিতে এলডিপি ওই নির্বাচনে অংশ নাও নিতে পারে।
শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধ এবং উত্তরাঞ্চলের জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে এই বিভাগীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
কর্নেল অলি আহমদ বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশনের সদস্যরা বহাল থাকলে তাদের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু হবে না। এ অবস্থায় আমরা হয়ত ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব না।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানসম্মত গুরুত্বপূর্ণ সব পদে নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, রাষ্ট্রদূত, সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশনসহ সংবিধানে উল্লিখিত সব গুরুত্বপূর্ণ পদে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে একটি কমিটির সুপারিশে নিয়োগ দিতে হবে। আমরা নিজেদের জন্য কিছু বলছি না। আজ আপনি ক্ষমতায় আছেন, কাল বিরোধী দলে যেতে পারেন। তখন পরিস্থিতি কী হবে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাতেই ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলার কাজ চলছে উল্লেখ করে অলি আহমদ বলেন, আমাদের লক্ষ্য কোনো মন্ত্রিত্ব, গাড়ি বা বাড়ি পাওয়া নয়। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানবতা, সুশাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। সেখানে চাঁদাবাজি, অন্যায় ও অবিচারের কোনো স্থান থাকবে না। মানুষ নিরাপদে ও শান্তিতে নিজ নিজ কাজ করতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনিও রংপুরে এসে জনগণকে বিএনপিকে একটি ভোট এবং সংস্কারের জন্য একটি ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই কথাটি স্মরণ রাখুন। এটি আপনার জন্যও মঙ্গলজনক। আমরা বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ করছি। এরপর জেলা, উপজেলা পর্যায়ে হবে। প্রয়োজন হলে সারা বাংলাদেশ অচল করে দেওয়ার মতো কর্মসূচিও দেওয়া হবে। সেই পরিস্থিতি তৈরি করবেন না। সংসদে বিল এনে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করুন।
আবু সাঈদ-মুগ্ধের চোখে বাংলাদেশকে দেখেন : ব্যারিস্টার ফুয়াদ
আরেক বিশেষ অতিথি আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ তার বক্তৃতায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে ইঙ্গিত করে বলেন, আজকে শাসক গোষ্ঠী বাংলাদেশকে ভারতীয় আধিপত্যে নিতে চায়। জুলাই সনদ থেকে সরিয়ে এনে নতুন করে পুরাতন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিতে চায়। ১৪০০ শহীদের সঙ্গে গাদ্দারি করে দিল্লির কথা মতো চলতে চায়। তাদের আমরা মনে করিয়ে দেব বাংলাদেশে এখনো লক্ষ-কোটি শহীদ ওসমান হাদিরা পাড়ায়-মহল্লায় লাল সবুজের পতাকা, আজাদীদের স্বাধীনতা পাহারা দিচ্ছে। এই আজাদির স্বাধীনতা পাহারাদারি থেকে এ দেশের কোটি কোটি যুবক বৃষ্টি, বুলেট, রক্ত উপেক্ষা করে পাহারা দেবে।
তিনি আরও বলেন, শকুনের দৃষ্টি আমরা মেনে নেইনি, আগামীতেও মেনে নেব না। আমাদের লড়াই চলছে এবং চলবে। যারা সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করতে চাচ্ছেন, গভীর রাতে পুশইন করতে চাচ্ছেন। যারা শুভেন্দু অধিকারীর চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখতে চান, তাদের বলব চশমাটাকে বদলে ওসমান হাদির চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখেন। চশমাটাকে বদলে আবু সাঈদ-মুগ্ধের চোখ দিয়ে বাংলাদেশটাকে দেখেন। এই বাংলাদেশ আওয়ামীযুগে আর ফেরত যাবে না। শেখ হাসিনা আর ফেরত আসবে না। এ সময় দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই চালিয়ে যাবার জন্য তিনি আহ্বান।
১১ দলীয় ঐক্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে : রাশেদ প্রধান
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, আমরা ভালো আছি কিন্তু দেশটা ভালো নেই। রংপুর বিভাগ নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে ওই হিন্দুস্থান থেকে। তারা (ভারত) তাদের মানচিত্রে আমার রংপুর বিভাগকে সংযুক্ত করতে চায়। ওই আধিপত্যবাদী শক্তিকে জানিয়ে দিতে চাই আমার রংপুর বিভাগের দিকে চোখ তুলে তাকালে আপনাদের ওই সেভেন সিস্টার ভেঙে গুঁড়ো করে দেওয়া হবে।
রংপুর বিভাগে বন্ধ থাকা সুগার মিলগুলো চালুর দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, রংপুর বিভাগ যুগে যুগে অবহেলিত ছিল এবং এখনো আছে। এই বিভাগের যে সব চিনিকল ছিল, ভারত থেকে চিনি আমদানি করার জন্য ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়ে বন্ধ থাকা চিনিকল চালুর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, ভারতকে সন্তুষ্ট করার জন্য সীমান্তবর্তী এলাকা লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁওয়ের বিমানবন্দর উদ্বোধনের জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে খালি কানে শুনতে পাই করব, করছি, হবে, হচ্ছে, আই হ্যাভ এ প্ল্যান। পরিকল্পনা শুনতে চাই না। আই হ্যাভ এ প্ল্যান শুনতে চাই না, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন দেখতে চাই। সেটা যদি করতে না পারেন, তাহলে আমরা আমিরে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য কাঁধে কোদাল নিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করে দেব ইনশাআল্লাহ।
বিভাগীয় এই সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এতে সভাপতিত্ব করেন।
এ সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন বক্তব্য দেন।
এছাড়াও সমাবেশের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এটিএম আজম খান, সেক্রেটারি কেএম আনোয়ারুল হক কাজল, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা আহ্বায়ক আল মামুন, মহানগরের সদস্য সচিব আব্দুল মালেকসহ ১১ দলীয় ঐক্যের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এমএন
