নারী পোশাক শ্রমিক নাসরিন, কাজ করেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার একটি তৈরি পোশাক কারখানায়। সংগ্রামী এই নারীর মাথায় একটি ব্যাগ, হাতে কয়েকটা হাড়ি পাতিল। কোমর পানি মারিয়ে বাসা ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন সড়কের পাশে। তীব্র জলাদ্ধতায় তার মাথা গোঁজার ঘরটি ঢুবে গেছে তার। শুধু নাসরিন নয়, এমন আরও বহু পরিবারের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র দেখা যাচ্ছে কালিয়াকৈর পৌরসভার হরিণহাটি, বিশ্বাসপাড়া, পল্লীবিদ্যুত এলাকায়। দ্বিতীয় দফায় পানিবন্দি মানুষ এবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে ছাড়ছেন ঘরবাড়ি।
রোববার (১২ জুলাই) সকাল থেকে জেলার কালিয়াকৈর পৌরসভার কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানিবন্দি মানুষের করুণ দুর্ভোগ।
ডুবে যাওয়া আটশতাধিক ঘরবাড়িতে কোনো মানুষজনের দেখা নেই। কোথাও কোথাও ঘরের বারান্দা পর্যন্ত ডুবে আছে। ঘড়বাড়ির পাশাপাশি দোকানপাট, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল, মসজিদ মাদরাসা সবখানেই জলাবদ্ধতা। এতে অচল হয়ে পড়েছে ব্যস্ত এই নগরী। টানা ২ দিন ধরে জলাবদ্ধতায় নাকাল হাজারো মানুষ ঘড় ছেড়ে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে অন্যান্য এলাকায়। কেউ আবার বারান্দার চালে, কেউ ঘরের ভেতর খাট উঁচু করেই কোনোরকম দিন পার করছে।
এদিকে ডুবে যাওয়া এলাকাগুলোতে পানির পাম্প, টিউবয়েল ডুবে থাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। এতে পানিবন্দি মানুষ বোতল, কনটেইনার ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। এছাড়াও এসব এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন বন্ধ থাকায় রান্নাবান্না করে খাওয়ার উপক্রম নেই।

জানা গেছে, কালিয়াকৈর পৌরসভার অধিকাংশ মানুষ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে জীবিকার তাগিদে এ এলাকায় বসবাস করেন। আর তাদের বড় একটি অংশই পোশাক শিল্পের প্রধান রসদ অর্থাৎ শিল্প শ্রমিক। পুরো এলাকা পানি বন্দি থাকায় তারা এখন এসব এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। এতে শিল্প কারখানায় একদিকে যেমন কমেছে শ্রমিকের উপস্থিতি, অন্যদিকে এসব কারখানাগুলোতে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
আফজাল হোসেন নামে এক বাসিন্দা ঢাকা পোস্টকে বলেন, গতকাল সকাল থেকে ঘড় ডুবে আছে, ঘর ছেড়ে এসেছি। সব মালামাল, চাল ডাল ঘরের ভেতর। কোনোরকম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বের হয়ে চলে এসেছি। ঘর থেকে একটা জিনিস বের করতে পারিনি। ঘরের ভেতর কোমর পানি। এই এক মাসে দুইবার এমন দুর্দশায় পড়লাম। এগুলো দেখবে কে, আমরা তো ট্যাক্স দিয়েই থাকি। পৌরসভার কেউ তো এখন আমাদের খোঁজ নেয় না।
মনোয়ার হোসেন নামে এক মুদি দোকানদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার দোকানের সব মালামাল পানিতে ভাসছে। কিছুই বাহির করতে পারিনি। ১৫ দিন আগেও এভাবে ডুবছে দোকান ঠিক করছি। আবারও একই অবস্থা হল।
নারী পোশাক শ্রমিক নাসরিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ৪ বছর ধরে এখানে বসবাস করি। আগে কখনো এমন কষ্ট দেখিনি। এর চেয়ে তো নদী পাড়ের মানুষের জীবন ভালো। গত ১৫ দিন আগে পানিতে ডুবে সব মালামাল নষ্ট হয়েছে, এখন আবারও হল। চাকরি করে কিছু শখের জিনিস কিনেছিলাম সব পানিতে শেষ করে দিল।
এদিকে পানি নিষ্কাশনের ড্রেন পরিষ্কারে কাজ চালাচ্ছে পৌর কর্তৃপক্ষ। তবে নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে ও অধিক পানি জমে যাওার কারণে ড্রেনগুলো পানি ধারণক্ষমতার বাইরে রয়েছে বলে জানান কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম ফখরুল হোসাইন।
তিনি আরও জানান, দুইদিন আগে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, আমরা সাথে সাথে প্রধান খালগুলোতে পানি নিষ্কাশনের কাজ করছি। যত ড্রেন, নালা আছে সবগুলোতে আমরা পানি নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তবে অধিক বৃষ্টির কারণে পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৬ জুন ভোরে দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে আকস্মিকভাবে ডুবে যায় পৌরসভার এই এলাকাগুলো। এতে অসংখ্য আবাসিক কলোনি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল ও শিল্প কারখানায় পানি প্রবেশ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েন ক্ষুদ্র দোকানিরা। দিনভর পানিবন্দি মানুষ দিক বিদিক ছুটোছুটি করে টিনের চালে, সড়কের পাশে ও ভবনের ছাদে আশ্রয় নেয়। এ ঘটনার চারদিন পর পানি নেমে যায়।
আশিকুর রহমান/এসএইচএ
