বিজ্ঞাপন

৫১ লাখ টাকার জালিয়াতি, পাঁচ দিনেই উপজেলা পরিষদের সেই তিন কর্মচারীর জামিন

৫১ লাখ টাকার জালিয়াতি, পাঁচ দিনেই উপজেলা পরিষদের সেই তিন কর্মচারীর জামিন

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলের ২৬টি সরকারি চেক জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৫১ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া তিন সরকারি কর্মচারী জামিন পেয়েছেন। 

রোববার (১২ জুলাই) ফুলগাজী আমলি আদালতের বিচারক মো. শহীদুল ইসলাম তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।

এর আগে, গত ৭ জুলাই উপজেলা পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর আব্দুল হালিম চৌধুরী বাদী হয়ে ফুলগাজী থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় উপজেলা পরিষদের সাবেক কম্পিউটার অপারেটর পার্থ সারথী পাল, বর্তমান অফিস সহায়ক মো. ফিরোজ ও নুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পার্থ সারথী পাল বর্তমানে ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদে কর্মরত।

পুলিশ সূত্র জানায়, সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের এখতিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। এই কারণে আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্তের জন্য বিষয়টি দুদকে পাঠানো হয়েছে। দুদকও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন।

মামলার বাদী আব্দুল হালিম চৌধুরী বলেন, রোববার মামলার শুনানির বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। আদালতে যেতে বলা হয়নি এবং বাদীপক্ষের কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন কি না, সেটিও আমার জানা নেই।

ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নিশাত তাবাসসুম বলেন, উপজেলা পরিষদের এজাহারের ভিত্তিতে থানায় মামলা নেওয়া হয়েছিল। পরে আইনগতভাবে এটি পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত নয় বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে মামলাটি দুদকে পাঠানো হয়েছে।

তিন অভিযুক্ত জামিন পেয়েছেন, নাকি অব্যাহতি-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি আদালতের সিদ্ধান্ত। পুলিশের এ বিষয়ে কোনো এখতিয়ার নেই। কারণ বিষয়টি এখন দুদকের তদন্তাধীন।

এদিকে চেক জালিয়াতির ঘটনায় পরবর্তীতে করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) অনুলিপিও দুদক সমন্বিত নোয়াখালী কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

দুদকের নোয়াখালী সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক জাহেদ আলম বলেন, অভিযোগটি দুদক আইনে বিচারযোগ্য। এ ধরনের অভিযোগের তদন্ত দুদকই করে থাকে।

ফুলগাজী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মিজানুর রহমান বলেন, এটি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ। তাই তদন্ত ও বিচারিক এখতিয়ার দুদকের। আদালতও মামলার ডকেট দুদকে পাঠানোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। একই ঘটনায় থানা ও দুদকের তদন্ত একসঙ্গে চলার সুযোগ নেই। দুদক তদন্তে কারা জড়িত, কারা উপকৃত হয়েছে এবং অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে।

বর্তমানে ফুলগাজীর অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতনু বড়ুয়া বলেন, মামলার বিচারিক বিষয় আদালতের এখতিয়ার। বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩ মার্চ পর্যন্ত আট মাসে ২৬টি চেকের প্রতিটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) স্বাক্ষরের পর মূল অঙ্কের সঙ্গে কৌশলে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা এবং কথার অংশেও একই পরিমাণ অর্থ যুক্ত করা হয়। এভাবে ধারাবাহিকভাবে জালিয়াতি সংঘটিত হয়। এ ঘটনায় প্রশাসনিক তদারকিতে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে ফুলগাজী উপজেলার বিদায়ী ইউএনও ফাহরিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২৬টি চেকে প্রকৃত অনুমোদিত অর্থ ছিল ৭ লাখ ৪৫৫ টাকা। কিন্তু প্রতিটি চেকে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা যোগ করে ব্যাংক থেকে মোট ৫১ লাখ ৪৫৫ টাকা উত্তোলন করা হয়। প্রথম জালিয়াতির ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই অফিস আপ্যায়ন খাতের ৩ হাজার টাকার একটি চেকে। সেটি পরিবর্তন করে ২ লাখ ৩ হাজার টাকা করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩ মার্চ গাড়ির জ্বালানি বিলের ১৬ হাজার ৭২২ টাকার চেকেও একই কৌশলে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা যোগ করা হয়।

জানা গেছে, দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতিকালে সদ্য বিদায়ী ইউএনও এবং উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ফাহরিয়া ইসলাম চেকবইয়ের কাউন্টারফয়েল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রেজিস্টার ও ভাউচার মিলিয়ে হিসাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে অসঙ্গতি শনাক্ত করেন। পরে বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে চেক জালিয়াতির বিষয়টি উদঘাটিত হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, মামলাটি দুদকে করা হলে যথাযথ হতো। তবে সে সময় ইউএনও আমাকে জানিয়েছিলেন, অভিযুক্তরা আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। তাদের দ্রুত হাজতে পাঠানোর উদ্দেশ্যেই থানায় মামলা করা হয়ে থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, জামিন পেলেও অভিযুক্ত তিন কর্মচারী ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদে কর্মস্থলে যোগ দিতে পারবেন না। উপজেলা প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে। সোমবার (১৩ জুলাই) এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে এবং এর মধ্য দিয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

তারেক চৌধুরী/ডিএ

বিজ্ঞাপন