বিজ্ঞাপন

জৈব সারের ব্যবহারে লাভবান হচ্ছেন কুড়িগ্রামের কৃষক

জৈব সারের ব্যবহারে লাভবান হচ্ছেন কুড়িগ্রামের কৃষক

কুড়িগ্রামে জৈব সারের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এতে করে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমে আসায় লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। জৈব সার দিয়ে আবাদ করায় উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ নিরাপদ ফসল উৎপাদন হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মীরের বাড়ি গ্রামের কৃষক দম্পতি মিনতী রাণী ও কানাই চন্দ্র ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন করছেন। নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি তারা এ সার অন্য কৃষকদের কাছেও বিক্রি করছেন।

ট্রাইকো কম্পোস্ট উপকারী ছত্রাক ‘ট্রাইকোডার্মা’ সমৃদ্ধ একটি উন্নত ও পরিবেশবান্ধব জৈব সার। গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, ডিমের খোসা, খৈল, কচুরিপানা, খড়, কাঠের গুঁড়া, ছাই, চা পাতা, মেহগনির ফল, নালী গুড় এবং ট্রাইকোডার্মার মিশ্রণে এ সার উৎপাদন করা হয়।

এ সার মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষতিকর ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ দমনে প্রাকৃতিক প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। এটি মাটিতে উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং মাটির অম্লত্ব-ক্ষারত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে এটি প্রাকৃতিক বালাইনাশক হিসেবেও কার্যকর।

বিশেষ করে শিকড় পচা, ঢলে পড়া এবং উইল্ট রোগের মতো মাটিবাহিত ক্ষতিকর ছত্রাক দমনে ট্রাইকো কম্পোস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি গাছের শিকড় মজবুত করে এবং উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সহজলভ্য করে তোলে। ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ও লিচেট ব্যবহারে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। ট্রাইকো কম্পোস্ট মাটির গঠন ও বুনট উন্নত করে, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং পানির অপচয় রোধ করে।

এ ছাড়া ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদনের সময় যে লিচেট বা তরল উপাদান সংগ্রহ করা হয়, তা বিভিন্ন সবজি, পানের বরজ ও ফলগাছে ব্যবহার করা যায়। এর মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগবালাই নিয়ন্ত্রণও সম্ভব হয়। স্বল্প খরচে এবং সহজ পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়ায় ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ও লিচেটের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জমি তৈরির সময় প্রতি শতকে ৮ থেকে ১০ কেজি হারে ট্রাইকো কম্পোস্ট প্রয়োগ করতে হয়। টমেটো, বেগুন, শসা, পেয়ারা, আম ইত্যাদি গাছে চারা লাগানোর সময় ২ হতে ৩ কেজি সার গর্তে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহারে জমির রাসায়নিক সারের চাহিদা প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ট্রাইকো লিচেট এটি বোতলে সংগ্রহ করে ১৫-২০ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করা হয়। এটি অত্যন্ত কার্যকরী বালাইনাশক হিসেবে কাজ করে। ট্রাইকো কম্পোস্ট সার জেলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পরিবেশবান্ধব জৈব সার হয়ে উঠেছে।
কৃষকরা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে এই উন্নত মানের সার বাজারে বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করছেন। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর এবং লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় এসব জৈব সার বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন উদ্যোক্তারা।

কৃষক কানাই চন্দ্র বলেন, ১শ কেজি ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সার তৈরি করতে গোবর ৬০ কেজি, কচুরিপানা ৫ কেজি, খড়-কাঠের গুড়া ১০ কেজি, চা পাতা ১০ কেজি, ছাই ৫ কেজি, বাড়িরবর্জ্য ৫ কেজি, ডিমের খোসা, মেহগনি গাছের ফলের খোসা এক কেজি, নালী গুড় এবং ট্রাইকোডার্মা ১০০ গ্রাম করে দেওয়া হয়। এতে প্রায় ৪৫ দিনের মধ্যে জৈব পদার্থ পচে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদিত হয় এবং লিচেট পাওয়া যায়।

কৃষাণী মিনতী রাণী বলেন, বছরে আমরা প্রায় ১০ হাজার কেজি জৈব সার উৎপাদন করি। এই সার আমরা নিজেদের জমিতে ব্যবহার করছি এবং  ১০ হতে ১৫ টাকা কেজিতে স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়। এতে নিজেদের চাহিদা পূরণ হবার সঙ্গে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ধরলা ট্রাইকো কম্পোস্ট উদ্যোক্তা মাসুম মিয়া বলেন, আরডিআরএস এবং পিকেএসএফ-এর সহযোগিতায় আমি ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করি। চলতি মৌসুমে ১২০ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হয়েছে আগামী মৌসুমে ৪০০ টন জৈব সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি।

শ্রমিক বিধান চন্দ্র ও বুলবুলি বলেন, এই অঞ্চলে কাজের তেমন কোনো কর্মসংস্থান নেই। শুধু কৃষি কাজের ওপর নির্ভর থাকতে হয়। আমাদের গ্রামে জৈব সার উৎপাদন শুরু হওয়ায় ২০ হতে ৩০ জন নারী-পুরুষের স্থায়ী কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে কাজ করে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি পাই। বাড়ির কাজ শেষ করে সকাল ৮টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করে থাকি। এতে করে আমাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা নষ্ট এবং বাড়তি খরচ হয়। এতে লাভের চেয়ে লোকশান গুনতে হয় আমাদের। আমি জৈব সার ব্যবহার করার পর থেকে ভালো ফলন পাচ্ছি। ফলন ভালো হওয়ায় অন্য কৃষকেরাও ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ও লিচেট কিনে নিয়ে জমিতে ব্যবহার করছেন। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ায় লাভ হচ্ছে।

আরডিআরএস বাংলাদেশের কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সজিব আহমেদ বলেন, জেলায় কৃষকদের মাঝে এই সার ব্যবহার আগ্রহ বেড়েছে। জৈব সার ব্যবহারে কৃষি জমির মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর ফসল উৎপাদন হওয়ায় রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জীব-পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে। উপজেলায় জৈব সার উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করতে আরডিআরএস এবং পল্লী-কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে কাজ করছে। পরিবেশবান্ধব কৃষিকে উৎসাহিত করতে তৃণমূলের কৃষকদের এই সার তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, ট্রাইকো কম্পোস্ট থেকে উৎপাদিত সার ও লিচেট ব্যবহার করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। এতে করে নিরাপদ ফসলসহ জমির উর্বরতা বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি ভাবে কৃষকদের এই জৈব সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

মমিনুল ইসলাম বাবু/আরকে

বিজ্ঞাপন