জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সুবিধাভোগী হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তারা শত শত রক্ত, অশ্রুসিক্ত স্মৃতি সম্পূর্ণ বেমালুম ভুলে গিয়ে জুলাই চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিএনপি সরকারের দ্বিচারিতার বার্তা ১১ দলের পক্ষ থেকে আমরা বাংলাদেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।
সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যায় ফেনী শহরের একটি কনভেনশন হলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, গণভোটে রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আমাদের বাস্তবতা শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তারা (বিএনপি) ওয়াদা করেছিলেন বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক, মানবিক, ইনসাফপূর্ণ সাম্য ও মানবিক মর্যাদার সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। যেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন, বিদেশে অর্থপাচার, দেশের সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয়করণের পথ থেকে দেশকে ফিরিয়ে আনার কথা ছিল। এটিই ছিল জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা। সকল রাজনৈতিক দল মিলে ঐকমত্য কমিশনে যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে সেগুলোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
তিনি বলেন, বিএনপি আজ মুখে জুলাইয়ের কথা বলে, কার্যত জুলাইয়ের চেতনার দিকে যেতে দিচ্ছে না। আপনারা একই দিনে অনুষ্ঠিত দুইটি ভোটের মধ্যে একটি মেনে ক্ষমতায় গেলেও গণভোট উপেক্ষা করেছেন। এটা কি জাতির সাথে দেওয়া আপনাদের প্রতিশ্রুতি ছিল? জুলাই সনদে স্বাক্ষরের সময়েও বিএনপি স্বাক্ষর করেছিল, গণভোটের প্রস্তাবেও তাদের সম্মতি ছিল। আমরা বলেছিলাম আগে স্থানীয় নির্বাচন ও গণভোটের পর জাতীয় নির্বাচন হবে। কিন্তু তারা তখন কৌশলে সেটি মেনে নেননি। তাদের অন্তরে ছিল এক রকম, আবার মুখে ছিল আরেক রকম।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের সময়ের শেষ দিকে নিরুপায় হয়ে তারা গণভোটে হ্যাঁ-তে ভোট দিতে বলেছিলেন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই যেহেতু তখন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও গণভোটে হ্যাঁ-তে ভোট দিতে বলেছিলেন। তার মানে ৮৪টি রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিষয়ে তিনিও সম্মতি দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে জামায়াতের সেক্রেটারি বলেন, উনি হলেন সর্বমন্ত্রী। সংসদে প্রধানমন্ত্রী বসে থাকলেও তিনি তার পক্ষে কথা বলেন। দুনিয়ার কোনো দেশে এমনটি দেখিনি, কিন্তু সেটিও তিনি করেন। উনি তখন প্রত্যেকটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও কেন আপত্তি করেননি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বিপরীতে তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আমরা এখন আপত্তি করলে পরে যদি নির্বাচন না হয়। মূলত উনারা মুখে জুলাই সনদের কথা বললেও অন্তরে মানবেন না-এমনটাই ছিল।
তিনি বলেন, বিএনপি ইচ্ছে করে জুলাই সনদকে না মেনে, ৫ কোটি জনগণের গণরায়কে না মেনে জাতিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে চাচ্ছে। এটিই এখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করলে বিরোধীদল বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না। এটি বিরোধীদলীয় নেতা সংসদেও স্পষ্ট করেছেন। বিএনপি দুই দিকে দুটো বিভ্রান্তি তৈরি করে জনগণের মাঝে ধূম্রজাল তৈরি করেছে। এটি শুভঙ্করের ফাঁকি। সংসদের রায়কে রাজপথে ঠেলে দেবেন না। যতক্ষণ এ দাবি পূরণ না হবে সংসদ ও রাজপথে এ আন্দোলন চলবে।
জুলাই সনদ অস্বীকার করা জনগণের সাথে অন্তহীন প্রতারণা উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তারা (বিএনপি) বলে জুলাই সনদের সবকিছু মানবে। কিন্তু আমরা বলি জুলাই সনদ মানছেন না। তারা একবারো বলেন না ৭০ শতাংশ মানুষের গণভোটের রায়কে মানেন। জুলাই সনদের ৩৭টি সাংবিধানিক বিষয়ে যেখানে আমরা সকলে একমত হয়েছি, যেখানে রাষ্ট্রকে শোষণ করা থেকে রক্ষা করতে ও রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে জুলাই সনদ করা হয়েছিল। বিএনপি জুলাই সনদের ১৩ থেকে ১৪ জায়গায় নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় আওয়ামী ফ্যাসিবাদী, কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে যাবে। তারা গণভোট মানবে বলে না, জুলাই সনদের কিছু পয়েন্ট বাদ দিয়ে মানার কথা বলেন। তারা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো না মেনে অগুরুত্বপূর্ণগুলো মানার কথা বলছেন। আমরা বলব এসব অস্বীকার করাই হচ্ছে জনগণের সাথে অন্তহীন প্রতারণা।
এতে প্রধান বক্তা ছিলেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
তিনি বলেন, ইতিহাসের গতিধারায় জাতীয়তাবাদের যে রাজনীতি ছিল, শহীদ জিয়ার যে আদর্শিক রাজনীতি ছিল, তা থেকে আপনারা অনেক দূরে চলে গেছেন। আমাদের আহ্বান থাকবে, আপনাদের সঠিক রাজনীতির পথে ফিরে আসুন। তা না হলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো আরেকটি গণঅভ্যুত্থান আবার ফিরে আসবে।
জামায়াতে ইসলামীর ফেনী জেলা আমির মুফতি আব্দুল হান্নানের সভাপতিত্বে ও জেলা সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুর রহিমের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন জামায়াতের কুমিল্লা অঞ্চল টিমের সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ফেনী জেলা আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম সৈকত, এবি পার্টির জেলা সভাপতি মাস্টার আহসান উল্লাহ, খেলাফতে মজলিসের জেলার সভাপতি মাওলানা মোজাফফর আহমদ জাফরী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জেলা সভাপতি মাওলানা নাজমুল আলম, এনসিপির, বিডিপির জেলা সেক্রেটারি মো. ইসমাইল, জাগপার জেলা সভাপতি মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন ও ফেনী শহর শিবিরের সভাপতি শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
তারেক চৌধুরী/আরএআর
