বিজ্ঞাপন

লক্ষ্মীপুরে মশার কামড়ে বাড়ছে রোগবালাই, ওষুধ ছিটানো প্রকল্প স্রেফ কাগজে

লক্ষ্মীপুরে মশার কামড়ে বাড়ছে রোগবালাই, ওষুধ ছিটানো প্রকল্প স্রেফ কাগজে

লক্ষ্মীপুরে দিন দিন বেড়েই চলেছে মশার উপদ্রব। এরসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মশাবাহিত বিভিন্ন রোগবালাই। মশার যন্ত্রণায় ভোগান্তিতে রয়েছে লক্ষ্মীপুর পৌরবাসী। কয়েল কিংবা স্প্রে ব্যবহার করেও মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। 

এদিকে এমন পরিস্থতিতে পৌর এলাকায় মশা নিধনের ওষুধ ছিঁটানোর কোনো ফলপ্রসু কার্যক্রমও দেখা যাচ্ছে না। তবে প্রতিবছরই পৌরসভা মশা নিধনে ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম গ্রহণ করে। কিন্তু সচেতন মহলের দাবি, পৌরসভার মশা নিধন কার্যক্রম ফলপ্রসু হয় না। লোক দেখানো কিছু স্থানে ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছেটায়৷ আর পুরো প্রকল্পই থেকে যায় কাগজে-কলমে। তবে ডেঙ্গুরোধে জনসাধারণকে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখাসহ সচেতন রাখার আহ্বান জানিয়েছে সচেতন মহল।

জানা গেছে, ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে ২৮ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনে গঠিত লক্ষ্মীপুর পৌরসভা। প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। অপরিকল্পিত বর্জ্য ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার কারণে দিন দিন বাড়ছে নাগরিক দুর্ভোগ। এর ফলশ্রুতিতে যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তূপ ও ড্রেন পরিষ্কার না করায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ড্রেনের ভেতরে জমে থাকে পলিথিন, প্লাস্টিক, বাসাবাড়ির ময়লা ও জলাবদ্ধ নোংরা পানি। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এসব স্থান হয়ে উঠে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগবাহীর মশার প্রজননক্ষেত্র। যেখানে  মশার লার্ভা জন্ম নিয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে। একইসঙ্গে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ।  

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া তথ্য হিসেবে জেলায় গত সাড়ে তিন বছরে ৮ হাজার ১৫৩ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়। এরমধ্যে এ বছর জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ছয় মাসে ৪৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। তবে ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছে ৫ শতাধিক রোগী৷ গত দুই দিনে হাসপাতালে অর্ধশতাধিক রোগী ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। সাতজন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় দুইজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।

পৌরবাসীর অভিযোগ, লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় প্রায় ৩৪ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। তবে কোনোটিই পরিকল্পিত নয়। এই ড্রেনের পঁচা আর দুর্গন্ধযুক্ত পানি থেকেই মশার বিস্তার বেশি ঘটছে। এ ছাড়া প্রতিবছরই লক্ষ্মীপুর পৌরসভা থেকে মশা নিধনে ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু গত এক বছরে পৌরসভার কোথাও এর কার্যক্রম নজরে আসেনি। প্রকল্পটি কাগজ-কলমের বাইরে এসে দৃশ্যমান না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছে সচেতন মহল। 

সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর মা বলেন, আমার মেয়ের সাত দিন জ্বর ছিল। পরে তাকে হাসপাতালে আনা হলে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা যায় তার ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। তার রক্তের প্লাটিলেটও কমে গেছে। এখনো শংকামুক্ত নয়।

পৌরসভার লামচরী এলাকার ইয়াছিন মিয়া ও তারেক মাহমুদ জানান, হায়দার আলী সড়কের ড্রেন গত তিন বছরেও পরিষ্কার করা হয়নি৷ স্লাব পড়ে গিয়ে পানি নিষ্কাশন প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। ড্রেনের ভেতর জমে থাকা ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি থেকে হাজার হাজার মশা জন্ম নেয়। কয়েল জ্বালিয়েও মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তূপ থাকলে, তা পরিষ্কারেই কেউ উদ্যোগ নিচ্ছেন না।

মজুপুর এলাকার মুদি দোকানি রিয়াজ হোসেন ও ওষুধ ব্যবসায়ী সোহেল হোসেন জানান, রহমতখালী খালে মানুষ ময়া-আবর্জনা ফেলে পানি দূষিত করে ফেলেছে। এ ছাড়া মানুষের বাসাবাড়ির টয়লেটের পাইপ দিচ্ছে ড্রেনে। কিন্তু এসব বিষয়ে পৌরসভার কোনো অভিযান বা তদারকি নেই। ড্রেন ও খালের পচা পানি থেকে ডেঙ্গু মশা ছড়াচ্ছে। বছরখানেক আগে রিয়াজের স্ত্রী ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। এতে ৫০ ঊর্ধ্ব এই নারীকে ব্যাপক কষ্ট পেতে হয়েছে। পরে ঢাকায় ১৫ দিনের মতো তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সমসেরাবাদ এলাকার ব্যাংক কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন ও সরকারি কর্মচারী জাকির হোসেন জানান, আগে পৌরসভা থেকে বছরে একবার এক দিন বিভিন্ন এলাকায় ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম দেখা যেতো। গত দুই বছরে ওই কার্যক্রম দেখাই যাচ্ছে না। তবে শোনা যায় বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে পৌরসভা থেকে ওষৃধ ছিটানো হয়৷ মনে হচ্ছে তাদের এই কার্যক্রম শুধু সরকারি অফিসের জন্য, সাধারণ নাগরিকদের জন্য নয়।

ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম নিয়ে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের কাছে মশা নিধনের বরাদ্দসহ কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি নতুন এসেছি। জেনে বলতে হবে। এরপর একাধিকবার মোবাইলফোনে বিষয়টি জানতে চাইলেও ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি লাইন কেটে দেন। 

লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, সারা দেশের মতো লক্ষ্মীপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জুন-আগস্ট মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর আক্রমণ বেশি থাকে এবং লোকজন ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া বাহিত মশা নিধনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ফগার মেশিনের মাধ্যমে স্প্রে করতে হবে। আর দিনে হোক আর রাতে হোক মশারি ব্যবহার করতে হবে। বাসাবাড়ির আশপাশের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলতে হবে। সবমিলিয়ে নিজেও সচেতন হতে হবে, অন্যকেও সচেতম করতে হবে।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভা প্রশাসক সম্রাট খীসা বলেন, পৌরসভা থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংসের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মশক নিধনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি আমরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেষ্ট হবো। পাশাপাশি তিনি সাধারণ জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

হাসান মাহমুদ শাকিল/এএমকে