স্বপ্নীল শুভ্র (ছদ্মনাম), বয়স মাত্র ১৯ বছর। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তিনি। বিসিএস কর্মকর্তা হয়ে বাবা-মায়ের দুঃখ ঘোচানোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু একটি সিদ্ধান্ত তার জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে। মরণব্যাধি এইডস এখন তার শরীরে বাসা বেঁধেছে।
এই গল্প শুধু একজনের নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত যশোরে ৩১০ জন এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তি নিয়মিত কাউন্সেলিং ও অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল (এআরটি) চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৯ জন মারা গেছেন এবং ১১ জন আত্মগোপনে আছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ২৯০ জন। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- চলতি বছরেই নতুন করে ৪৮ জন শনাক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৫ জনই বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী এবং সমকামী সম্পর্কের মাধ্যমে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে যশোর স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। বাকি ১৩ জন বিদেশফেরত।
চিকিৎসাকেন্দ্রে শুভ্রর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের একটি দোকানে অনলাইনে আবেদনের কাজ করেন এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। পরে দোকানে গেলে তিনি আমার শরীর ম্যাসাজ করে দেন। কিছুদিন পর রোমান্সের কথা বলে তিনি আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যান। বাবা-মা বাড়িতে না থাকার সুযোগে সেখানে রাত্রিযাপনের মধ্য দিয়ে আমি সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। এরপর আরও তিন-চার মাস বিভিন্ন মেসে এই সম্পর্ক চলতে থাকে।
শুভ্র আরও বলেন, একপর্যায়ে আমার আরও তিন রুমমেট এতে জড়িয়ে পড়েন। ৯ থেকে ১০ মাস পর আমাদের শরীরে এইডসের লক্ষণ দেখা দেয়— দুর্বলতা, জ্বর, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা, রক্ত পাতলা হয়ে যাওয়া। পরে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের এটিসি (এইডস ট্রেনিং কাউন্সেলিং) বিভাগে পরীক্ষায় এইডস ধরা পড়ে।
আক্রান্তদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও সংক্রমণের পথ প্রায় এক। কেউ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গদোষে জড়িয়েছেন, কেউ স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হয়ে, আবার কেউ হিজড়া সম্প্রদায়ের প্ররোচনায় এটিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।
অনার্সপড়ুয়া আরেক শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন (ছদ্মনাম) ক্যাম্পাসে আড্ডার সময় দুজনের সঙ্গে পরিচিত হন। তারা তাকে একসঙ্গে বাইরে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে যাই এবং সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। তাদের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হই।
আরাফাত জানান, ‘বটম’, ‘সিক্স’, ‘থ্রি’, ‘টেক্কা’, ‘দুক্কা’সহ সাংকেতিক নামে একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ঘিরে এই নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যার সদস্য সংখ্যা অন্তত এক হাজার।
তিনি বলেন, এসব গ্রুপে সদস্যরা একে অপরকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং যৌনসম্পর্কে উৎসাহিত করেন, যার মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে।
আক্রান্তরা সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। পরিবার মাঝেমধ্যে শুধু খোঁজ নেয় তারা বেঁচে আছেন কি না। অনেকে শহরে বা অজানা স্থানে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ কেউ পরিবার থেকে আর্থিক সহায়তা পান, অনেকে তা-ও পান না।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি এমএম কলেজ ও সিটি কলেজে একই বিষয়ে পড়াশোনা করেন আকিব হাসান, আব্দুল আল সায়েম ও আকাশ সাফফাত (ছদ্মনাম)। মণিহার মোড়ে নিয়মিত আড্ডা দেওয়ার সময় দুই হিজড়ার সঙ্গে তাদের পরিচয় হয় এবং পরে তাদের প্ররোচনায় সমকামী সম্পর্কে জড়ান। বর্তমানে তিনজনই এইচআইভি এইডসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আকাশ সাফফাত বলেন, আমরা সবাই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি। মেসে জীবনযাপন করি। আর কত দিন বাঁচব জানি না। মৃত্যুর ভয় প্রতিনিয়ত তাড়া করে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত আমার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে।
যশোরে সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক সময় এইচআইভি প্রতিরোধে টিভি বিজ্ঞাপন, দেয়ালিকা, পোস্টার ও মাইকিংয়ের মতো কর্মসূচি চালু ছিল, যা এখন আর চোখে পড়ে না। সচেতন মহল মনে করছে, এই রোগ প্রতিরোধে ফের সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন বলেন, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের এইডস প্রতিরোধে একযোগে কাজ করতে হবে। তার মতে, একজন ব্যক্তি কীভাবে এইচআইভিতে সংক্রমিত হয়েছেন, তা আগে খুঁজে বের করা জরুরি। পরিচয় গোপন রেখে সংক্রমণের উৎস চিহ্নিত করা গেলে সমস্যার সমাধান সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।
অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন আরও বলেন, এটি সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র। তবে এইচআইভি আক্রান্ত মানেই খারাপ চরিত্রের— এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন, কারণ নানা কারণে একজন ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন। সমাজ তাদের দূরে ঠেলে দিলে সংক্রমণের উৎস খুঁজে বের করা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, ‘এইডস কি? বাঁচতে হলে জানতে হবে’— এই পুরোনো স্লোগানের সঙ্গে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম পরিচিত নয়। তাই জেনারেশন-জেডের উপযোগী নতুন স্লোগানে সচেতনতামূলক প্রচারণা প্রয়োজন।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. কানিজ ফাতেমা জানান, নিয়মিত ওষুধ (এআরটি) সেবন করলে একজন এইচআইভি পজিটিভ বা এইডস রোগী স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল পেতে পারেন। তবে সন্তান কোথায় কী করছেন, তা মা-বাবার নজরে রাখা জরুরি। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি এবং এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়ও রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, এইচআইভি সংক্রমণ বাড়া উদ্বেগের বিষয়। আক্রান্তদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সচেতনতা জরুরি। সংক্রমণ হঠাৎ বাড়ে না, দীর্ঘ সময় ধরে বিস্তার লাভ করে। তিনি সচেতনতা ও পরীক্ষার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, এককভাবে এইচআইভি প্রতিরোধ সম্ভব নয়, এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। জেলার সব হেলথ কমপ্লেক্সে এ নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোয় স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো এবং প্রতিটি মসজিদে অন্তত জুমার খুতবায় ইমামদের এইডস বিষয়ে জনসচেতনতামূলক বার্তা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে চিঠি দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে যশোরে মানুষের চলাচল বেশি হওয়ায় সচেতনতা কর্মসূচি, স্বেচ্ছায় পরীক্ষা, কাউন্সেলিং ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও কমিউনিটিতে বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা বাড়ানোও জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তদের প্রতি বৈষম্য নয়, বরং সহমর্মিতা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরএআর
