তিস্তা নদীর তীব্র স্রোতে রংপুরের গঙ্গাচড়া ও লালমনিরহাট সদরের সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন নির্মিত তীর সংরক্ষণ কাজের প্রায় ১৩০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে কয়েকটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। এতে প্রায় ২ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং আমন ধানের বীজতলা তলিয়ে গেছে। নতুন করে ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্কে তীরবর্তী পরিবারগুলোর দিন কাটছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে তিস্তার ভাঙনে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মর্ণেয়া ইউনিয়নের নরশিং ও তালপট্টি এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর হাজীপাড়া, পশ্চিম হাজীপাড়া, পূর্ব হাজীপাড়া, হরিণচড়া এলাকার হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও জীবিকার শেষ সম্বল হারিয়েছেন। দীর্ঘদিনের দাবির পর চলতি বছর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর উদ্যোগে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ওই এলাকায় তীর সংরক্ষণের কাজ বাস্তবায়ন করেন। নতুন বাঁধ নির্মাণে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও তা স্থায়ী হয়নি।
সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয়। তীব্র স্রোতে নতুন নির্মিত তীর সংরক্ষণ কাজের প্রায় ১৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়। একই সঙ্গে নদীর পানিতে কয়েকটি বসতবাড়ি ভেঙে যায়, হাজারের বেশি বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে এবং বিস্তীর্ণ এলাকার আমন ধানের বীজতলা তলিয়ে যায়।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সরেজমিন দেখা যায়, লালমনিরহাটের আদর্শপাড়া থেকে গঙ্গাচড়ার তালপট্টি হয়ে নরশিং পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় তীর সংরক্ষণকাজ করা হয়েছিল। গত কয়েক দিন ধরে তীব্র স্রোতের কারণে বাঁধটির বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। সোমবার রাতের পানি বৃদ্ধির পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন স্থানে ধস দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি দ্রুত ওঠানামা করছে। আকস্মিক বন্যা, তীব্র স্রোত এবং হঠাৎ পানি কমে যাওয়ার কারণে নদীর তীরজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার পরিবারের বসতভিটা, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে।
তালপট্টি গ্রামের আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অনেক আশা নিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। ভেবেছিলাম এবার আর ভাঙন হবে না। কিন্তু কয়েক মাসও টিকল না। চোখের সামনে নতুন বাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
নরশিং এলাকার কৃষক নুর মোহাম্মদ বলেন, আগে বাঁধ ছিল না তখনও ভয় ছিল, এখন বাঁধ থেকেও ভয় হচ্ছে। কারণ সরকারের এত টাকার বাঁধ তো কোনো উপকারে আসছে না। স্বল্প মেয়াদী বন্যাতে যদি এত দ্রুত বাঁধ ভেঙে যায়, তাহলে এই বাঁধ দিয়ে আমাদের কী লাভ হলো? এখন আমাদের বাড়িঘর ও জমিজমা হারানোর ভয় বাড়ছে। শুধু জিও ব্যাগ ফেললেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটা স্থায়ী সমাধান ছাড়া এভাবে ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়।
হরিণচড়া গ্রামের সাইদুল বলেন, কয়েক দিনের নদীভাঙনে এখন দেখি বাঁধও বিলীন হতে চলেছে। এভাবে পুরো নদীতে গেলে আমরা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবো। এখন তো ভয়ে রাতে ঘুমও আসে না। মনে হয় কখন ঘরটাও নদীতে ভেঙে পড়ে। ভাঙন শুরুর পর দ্রুত ব্যবস্থা নিলে হয়তো এতটা ক্ষতি হতো না। এখন জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও ব্লক না ফেললে পুরো বাঁধই নদীগর্ভে চলে যাবে।
এ বিষয়ে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, নদীতে পানি বাড়া-কমায় এই ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে ৬ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের কাজ চলছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও জিও ব্যাগ ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড আরও জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক শূন্য পাঁচ মিটার, যা বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এখানে বিপৎসীমা ধরা হয় ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। একই সময়ে রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তা সেতু পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এই পয়েন্টে ২৯ দশমিক ৩০ মিটার বিপৎসীমা ধরা হয়।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এসএইচএ
